খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeআইন ও অপরাধবাংলাদেশে সমকামিতা কি অপরাধ? আইনে কী আছে, জানুন ৩৭৭ ধারা

বাংলাদেশে সমকামিতা কি অপরাধ? আইনে কী আছে, জানুন ৩৭৭ ধারা

এখানেই তৈরি হয় মূল আইনি জটিলতা। কারণ ৩৭৭ ধারায় ‘সমকামিতা’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। ফলে শুধু একজন ব্যক্তি সমকামী—এমন পরিচয়ের কারণে এই ধারা প্রয়োগের বিষয়টি আর কোনো যৌন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি এক নয়।

বাংলাদেশে সমকামিতা নিয়ে আলোচনা হলেই সামনে আসে ঔপনিবেশিক আমলের দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা। তবে এই ধারাটি সরাসরি ‘সমকামিতা’ শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করে না। বরং ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে’ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়কে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলে দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ ওঠার পর তাদের আবাসিক সিট বাতিল করা হয়েছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টির আরও কয়েকটি আবাসিক হলেও একই ধরনের অভিযোগের ঘটনা সামনে এসেছিল।

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের শৃঙ্খলাবিধিতে সমকামিতা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। ফলে অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশের আইনে সমকামিতা কি অপরাধ? সমকামিতার জন্য কি কাউকে শাস্তি দেওয়া যায়? আর দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় আসলে কী বলা হয়েছে?

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘সমকামিতা’ শব্দটির আলাদা কোনো আইনগত সংজ্ঞা নেই।

অর্থাৎ বাংলাদেশের কোনো আইনে সমকামিতাকে একটি নির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তার জন্য আলাদা শাস্তির বিধান করা হয়নি।

তবে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩৭৭ ধারায় ‘অপ্রাকৃতিক অপরাধ’ বা unnatural offences নিয়ে বিধান রয়েছে।

আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবালের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ধারায় ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে’ যৌন সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

এখানেই তৈরি হয় মূল আইনি জটিলতা। কারণ ৩৭৭ ধারায় ‘সমকামিতা’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। ফলে শুধু একজন ব্যক্তি সমকামী—এমন পরিচয়ের কারণে এই ধারা প্রয়োগের বিষয়টি আর কোনো যৌন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি এক নয়।

দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা পশুর সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করলে তিনি শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপে রাজনৈতিক প্রভাব? ট্রাম্প-ইনফান্তিনো সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের দাবিতে সরব ইউরোপ

এই অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে অর্থদণ্ডের ব্যবস্থাও রয়েছে।

আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল জানিয়েছেন, এই ধারার আওতায় অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্কের ধরন এবং অনুপ্রবেশের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ ৩৭৭ ধারার বিষয়টি শুধু ব্যক্তির যৌন পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; বরং নির্দিষ্ট ধরনের যৌন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে কি না, সেটিই আইনি বিচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

কারও যৌন অভিমুখিতা বা সমকামী পরিচয়কে আলাদা অপরাধ হিসেবে বাংলাদেশের আইনে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।

কিন্তু দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বর্ণিত নির্দিষ্ট যৌন কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবালের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আইনে সমকামিতাকে সরাসরি স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি—কোনোটিই দেওয়া হয়নি। আইনে মূলত ‘অপ্রাকৃতিক’ যৌন কর্মকাণ্ডের কথা বলা হয়েছে।

এই কারণে ‘সমকামিতা’ এবং ‘৩৭৭ ধারার অপরাধ’—দুটিকে একই বিষয় হিসেবে দেখলে আইনি অর্থে ভুল হতে পারে।

না।

এটিও ৩৭৭ ধারা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ধারাটির ভাষায় পুরুষ, নারী এবং পশুর সঙ্গে ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে’ যৌন সম্পর্কের কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু দুই পুরুষ বা দুই নারীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হয়নি।

ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত এই আইনটি যৌন কর্মকাণ্ডের একটি নির্দিষ্ট ধরনকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছিল।

ফলে বর্তমান সময়ে ‘সমকামিতা’ নিয়ে যে সামাজিক ও আইনগত আলোচনা হয়, তার সঙ্গে ১৮৬০ সালের এই আইনের ভাষা সরাসরি এক করে দেখা জটিল।

আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবালের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩৭৭ ধারা খুঁজলে কিছু মামলা পাওয়া যেতে পারে। তবে তার মতে, এসব মামলার বড় অংশই বলাৎকার বা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্কের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সম্মতিপূর্ণ সমলিঙ্গের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ধারায় শাস্তির নজির তার জানা নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন :  মেসিকে স্পেনের জার্সিতে খেলানোর পরিকল্পনা! এক ভিডিও ক্যাসেট বদলে দিয়েছিল ফুটবল ইতিহাস

এখানে ‘সম্মতি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজের সম্মতিতে কোনো সম্পর্কে রয়েছেন—এবং কোনো ব্যক্তির ওপর জোরপূর্বক যৌন নির্যাতন করা হয়েছে—এই দুই পরিস্থিতি আইনগতভাবে এক নয়।

আইনজীবীর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অতীতে বলাৎকারের অভিযোগেও দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা ব্যবহার করা হতো।

পরবর্তীতে নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত আইনে বলাৎকারের বিষয়টি আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত ও অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ৩৭৭ ধারার প্রয়োগের ক্ষেত্রও বদলেছে।

আইনের কোনো একটি ধারার নাম শুনেই সেটিকে সমকামিতার জন্য সরাসরি শাস্তির বিধান হিসেবে ধরে নেওয়া তাই সঠিক নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে দুই শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে সমকামিতার অভিযোগ ওঠার পর তাদের সিট বাতিলের বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধিতে সমকামিতা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন হলো—কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে বিশ্ববিদ্যালয় কোন বিধানের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে পারে?

কেবল অভিযোগ এবং প্রমাণিত আচরণের মধ্যে পার্থক্য করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে—এমন নয়।

বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিধি, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং প্রমাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের মতো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের আইনের প্রভাব এখনও দেখা যায়।

পাকিস্তান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই ও শ্রীলঙ্কায় বিভিন্নভাবে ঔপনিবেশিক আমলের ‘অপ্রাকৃতিক’ যৌন কর্মকাণ্ডসংক্রান্ত আইন টিকে রয়েছে।

তবে এশিয়ার সব দেশের পরিস্থিতি এক নয়।

ভারতে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারার বড় অংশ ২০১৮ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বাতিল হয়। ওই রায়ের ফলে সম্মতিপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্ক সমলিঙ্গের সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ বন্ধ হয়।

আরও পড়ুন :  জুলাইয়ে ভয়ংকর খরা! এল নিনোর কারণে ৯৪% কম বৃষ্টি—ভারতে কী হতে যাচ্ছে?

তবে ভারতে সমলিঙ্গের বিয়ে এখনও আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়।

অন্যদিকে এশিয়ার কয়েকটি দেশে সমলিঙ্গের বিয়েও বৈধ হয়েছে। তাই পুরো এশিয়ায় সমকামিতা নিয়ে একই ধরনের আইন কার্যকর রয়েছে—এমনটা বলা যায় না।

এশিয়ার মধ্যে নেপাল সমলিঙ্গের অধিকার ও আইনি স্বীকৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

তাইওয়ান সমলিঙ্গের বিয়েকে বৈধতা দেওয়া এশিয়ার প্রথম দেশ। পরবর্তীতে থাইল্যান্ডও সমলিঙ্গের বিয়ের বৈধতা দিয়েছে।

অন্যদিকে কিছু দেশে এখনও ঔপনিবেশিক আমলের আইন বহাল রয়েছে এবং সমলিঙ্গের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ দেখা যায়।

অর্থাৎ একই মহাদেশের মধ্যেই আইনগত অবস্থানের বড় পার্থক্য রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ‘সমকামিতা’ শব্দটি এবং দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বর্ণিত অপরাধকে এক করে দেখা যাবে না।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে ৩৭৭ ধারায় নির্দিষ্ট ধরনের যৌন কর্মকাণ্ডের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু সমকামিতাকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করে কোনো অপরাধের বিধান সেখানে নেই।

তাই কোনো ব্যক্তির যৌন অভিমুখিতা এবং তিনি কোনো নির্দিষ্ট যৌন কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছেন কি না—এই দুই বিষয়কে আইনগতভাবে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সংগঠন নিজস্ব শৃঙ্খলাবিধির আওতায় কী ধরনের আচরণকে শাস্তিযোগ্য মনে করবে, সেটিও পৃথক প্রশ্ন।

বাংলাদেশে সমকামিতা নিয়ে বিতর্কটি শুধু আইনকেন্দ্রিক নয়। এর সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধ, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলাবিধির প্রশ্নও জড়িত।

বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পুরোনো দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা আধুনিক আইন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণার সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এর প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট সীমা কোথায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই পুরোনো প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।

তবে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিধি এবং প্রচলিত আইনের নির্দিষ্ট ধারা—সবকিছু আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।

আর্কাইভ