খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালবিশ্বকাপে রাজনৈতিক প্রভাব? ট্রাম্প-ইনফান্তিনো সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের দাবিতে সরব ইউরোপ

বিশ্বকাপে রাজনৈতিক প্রভাব? ট্রাম্প-ইনফান্তিনো সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের দাবিতে সরব ইউরোপ

বিতর্ক বাড়তেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তাঁর দাবি, ট্রাম্প ফোন করেছিলেন ঠিকই, তবে সেই ফোনকলের সঙ্গে শাস্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তের কোনও সম্পর্ক নেই।

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। বিশ্বকাপ চলাকালেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের জেরে এক মার্কিন ফুটবলারের শাস্তি শিথিল করার অভিযোগ আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনার পর ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আইনপ্রণেতারা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন। একই সঙ্গে ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

বিশ্বকাপের মতো আন্তর্জাতিক আসরে সব দেশের জন্য একই নিয়ম কার্যকর থাকার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত সেই বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একই ধরনের অপরাধ করেও দুই ফুটবলারের ক্ষেত্রে ফিফা ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এই বৈপরীত্যের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বিশ্ব ফুটবলের নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। ইউরোপের ফুটবল মহলের মতে, যদি কোনও দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাব ফিফার সিদ্ধান্তে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্ব ফুটবলের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগুন একটি ম্যাচে লাল কার্ড দেখার পর তাঁকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী সেই শাস্তি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও পরে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই প্রকাশ্যে জানান, তিনি বিষয়টি নিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। এরপরই বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয় এবং তিনি বিশ্বকাপে খেলার অনুমতি পান।

এই সিদ্ধান্তের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে প্রশ্ন ওঠে—একজন রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে কথোপকথনের পর কেন এমন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?

বিতর্ক বাড়তেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তাঁর দাবি, ট্রাম্প ফোন করেছিলেন ঠিকই, তবে সেই ফোনকলের সঙ্গে শাস্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তের কোনও সম্পর্ক নেই।

তিনি জানান, ফিফা নিজস্ব নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, ঘটনাক্রম এতটাই প্রশ্নবিদ্ধ যে স্বাধীন তদন্ত ছাড়া সত্য সামনে আসবে না।

বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জ্যারেল কোয়ানসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। বালোগুনের মতো প্রায় একই ধরনের ফাউল করে তিনিও লাল কার্ড দেখেন।

কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে ফিফা কোনও নমনীয়তা দেখায়নি। বরং তাঁকে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় এবং ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্থাকে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আবেদন করার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

দুই ফুটবলারের ঘটনায় এমন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, নিয়ম যদি সবার জন্য সমান না হয়, তাহলে বিশ্ব ফুটবলের বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

এই বিতর্কের জেরে ইউরোপীয় সংসদের ৭২ জন সদস্য সরাসরি তদন্তের দাবি তুলেছেন। তাঁরা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের জাতীয় ফুটবল সংস্থার সভাপতিদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।

ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকেও আলাদাভাবে একই আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ফিফা সভাপতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্তকে সমর্থন করা প্রয়োজন, যাতে বিশ্ব ফুটবলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়।

আইনপ্রণেতাদের মতে, বালোগুনের শাস্তি স্থগিতের পেছনে রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।

ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর যোগাযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হোক।

তাঁদের বক্তব্য, কোনও রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক যোগাযোগ যদি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, তাহলে তা কেবল ফুটবলের জন্য নয়, গোটা ক্রীড়া বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার জন্য সদস্য সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শুধু তদন্তের দাবি নয়, প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দিকেও এগোতে চাইছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ। বিভিন্ন ফুটবল সংস্থা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এর আগেও ইউরোপীয় সংসদের ৫০ জন সদস্য সরাসরি ইনফান্তিনোর কাছে চিঠি পাঠিয়ে বালোগুনের শাস্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এবার সেই প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই ইস্যুতে স্বাধীন তদন্ত শুরু হয়, তাহলে ফিফার প্রশাসনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।

বিশ্বকাপ শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িত। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা ফিফার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

কিন্তু সাম্প্রতিক বিতর্ক দেখিয়ে দিয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলে সেই বিশ্বাস মুহূর্তেই নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। একই ধরনের অপরাধে ভিন্ন শাস্তি এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ বিশ্ব ফুটবলের ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

আগামী দিনে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থাগুলো তদন্তের দাবিতে কতটা একজোট হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। যদি সদস্য দেশগুলোর সমর্থন বাড়তে থাকে, তাহলে ফিফার ওপর স্বাধীন তদন্তের চাপ আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

অন্যদিকে, ফিফা যদি স্বচ্ছতার স্বার্থে তদন্তে সহযোগিতা করে, তাহলে বিতর্কের অবসান ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে যদি অভিযোগ উপেক্ষিত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রশাসনের প্রতি আস্থা আরও কমতে পারে।

জিয়ান্নি ইনফান্তিনো, ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফোলারিন বালোগুনকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিতর্ক এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত বিষয়। একই ধরনের ঘটনায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ এবং ইউরোপের তদন্ত দাবি—সব মিলিয়ে ফিফা কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে। এখন সবার নজর স্বাধীন তদন্তের সম্ভাবনা এবং ফিফা কীভাবে এই সংকট মোকাবিলা করে তার ওপর। স্বচ্ছতা ও সমতার নীতি বজায় রাখতে পারলেই বিশ্ব ফুটবলের প্রতি সমর্থকদের আস্থা অটুট রাখা সম্ভব হবে।