‘রিফিউজি’ বা শরণার্থী—শব্দটি উচ্চারণ করলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে সীমান্ত পেরিয়ে আসা অসহায় মানুষের ছবি। কিন্তু এই পরিচয় কি সত্যিই কলঙ্কের? নাকি এটি এমন এক মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক, যার দায় বহন করা উচিত রাষ্ট্র, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই প্রতি বছর ২০ জুন পালিত হয় বিশ্ব উদ্বাস্তু দিবস।
একজন মানুষ কখনও স্বেচ্ছায় নিজের জন্মভূমি, পরিবার, স্মৃতি কিংবা শিকড় ছেড়ে অজানা দেশে আশ্রয় নিতে চান না। যুদ্ধ, ধর্মীয় নিপীড়ন, জাতিগত বৈষম্য, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগই তাঁদের সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, যেসব মানুষ জাতিগত, ধর্মীয়, রাজনৈতিক বা সামাজিক নিপীড়নের কারণে প্রাণ বাঁচাতে নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এবং নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ হারান, তাঁদেরই শরণার্থী বা রিফিউজি বলা হয়।
এই পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শুধু ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়, বরং হারিয়ে যায় পরিচয়, জীবিকা, সামাজিক মর্যাদা এবং বহু প্রজন্মের স্মৃতি।
বিশ্বসাহিত্যে শরণার্থীদের জীবনসংগ্রাম বহুবার উঠে এসেছে। মার্কিন সাহিত্যিক পার্ল এস. বাক তাঁর বিখ্যাত গল্প The Refugee-এ এক বৃদ্ধ কৃষকের হৃদয়বিদারক কাহিনি তুলে ধরেছেন। ভয়াবহ বন্যায় তিনি হারিয়েছেন জমি, ঘরবাড়ি, সন্তান—সবকিছু। তবুও নাতিকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন করে জীবন শুরু করার স্বপ্ন তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
এই গল্প শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি বিশ্বের কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রতীক।
বিশ্ব ইতিহাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছিল সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি মানুষ নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
এরপর ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজন দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে এক ভয়াবহ শরণার্থী সংকট সৃষ্টি করে। মাত্র পাঁচ মাসে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্থানান্তরিত হন। পরবর্তী কয়েক দশকেও কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়।
দেশভাগের সময় পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৭২ লাখ শরণার্থী আশ্রয় নেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৬ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে আরও প্রায় ৪০ লাখ মানুষ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন।
১৯৬১ সালের জনসংখ্যার তথ্য বলছে, কলকাতার প্রায় ১৮ শতাংশ বাসিন্দাই ছিলেন উদ্বাস্তু পরিবার থেকে আসা।
এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নতুন করে ইতিহাস বদলে দেয়। যুদ্ধের ভয়াবহতায় প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এই বিপুল জনস্রোত শুধু মানবিক সংকটই তৈরি করেনি, বরং সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
একসময় বহু শরণার্থী নিরাপদে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারতেন। নব্বইয়ের দশকে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৫ লাখ উদ্বাস্তু নিজ দেশে ফিরে যান।
কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, কূটনৈতিক জটিলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে গত এক দশকে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে বছরে গড়ে মাত্র চার লাখে।
অর্থাৎ, আশ্রয় নেওয়ার মানুষের সংখ্যা বাড়লেও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
যদি সমাজে ‘রিফিউজি’ পরিচয়কে অবমূল্যায়নের চোখে দেখা হয়, তবে সেই দায় কখনোই বাস্তুচ্যুত মানুষের নয়।
প্রথম দায়িত্ব সেই রাষ্ট্রের, যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ধর্মীয় বিদ্বেষ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, জাতিগত সহিংসতা কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণে মানুষ যখন দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, তখন সেই ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে বাস্তুচ্যুত নাগরিকরা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরু করতে পারেন। ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং সামাজিক পুনর্গঠনও সেই দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া শুধু মানবিকতা নয়; আন্তর্জাতিক আইনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশন এবং ১৯৬৭ সালের প্রোটোকল অনুযায়ী, কোনো শরণার্থীকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তাঁর জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।
এ ছাড়া আশ্রয়দাতা দেশের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—
- নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ দেওয়া।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নিশ্চিত করা।
- শিশুদের আটক না রাখা।
- কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
- বৈষম্য, সহিংসতা ও শোষণ থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
শুধু রাষ্ট্র নয়, আশ্রয়প্রার্থীদেরও কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়।
তাঁদের আশ্রয়দাতা দেশের আইন মেনে চলতে হবে, স্থানীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধকে সম্মান করতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখতে হবে। পারস্পরিক সম্মানই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে তোলে।
শরণার্থী সমস্যা কোনো একক দেশের নয়; এটি বৈশ্বিক মানবিক সংকট।
এই কারণেই জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তুদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন এবং মানবিক সহায়তায় কাজ করে যাচ্ছে।
২০১৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ‘গ্লোবাল কমপ্যাক্ট অন রিফিউজিজ’ গ্রহণ করে। এতে চারটি মূল বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়—
১. আশ্রয়দাতা দেশগুলোর ওপর চাপ ভাগ করে নেওয়া।
২. শরণার্থীদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা।
৩. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
৪. নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
আজও বিশ্বের লাখো মানুষ জন্মভূমিতে ফিরতে পারেন না। অনেক শিশু এমন দেশে বড় হয়ে ওঠে, যেখানে তাদের জন্ম হয়নি। আবার বহু বৃদ্ধ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের গ্রামের মাটি স্পর্শ করার সুযোগ পান না।
এ বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শরণার্থী সংকট কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি মানবতারও পরীক্ষা।
‘রিফিউজি’ শব্দটি কোনো অপমানের প্রতীক নয়। বরং এটি এমন মানুষের পরিচয়, যাঁরা নিজেদের দোষে নয়, বরং যুদ্ধ, সহিংসতা, নিপীড়ন কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণে সবকিছু হারিয়েছেন।
তাই তাঁদের পরিচয়কে কলঙ্ক নয়, মানবিক সহমর্মিতার দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন। রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিশ্বসমাজ একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করলেই একদিন হয়তো প্রতিটি বাস্তুচ্যুত মানুষ আবার নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। আর সেদিনই ‘রিফিউজি’ শব্দটি সত্যিকার অর্থে কেবল একটি সাময়িক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, স্থায়ী ভাগ্যে নয়।
লেখক: চিরঞ্জীব রায়,(মতামত নিজস্ব)।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

