দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ধীরে ধীরে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় মার্কিন ডলারের সরবরাহ এখন তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকায় আন্তঃব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের বাজারে ডলারের দাম কমেছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আমদানি ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমে আসা এবং প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ডলারের বাজারে সাম্প্রতিক এই নিম্নমুখী প্রবণতা শুধু আন্তঃব্যাংক বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। স্পট মার্কেট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেনে ব্যবহৃত ডলারের দরেও কমতির চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফলে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১৬ আগস্ট) আন্তঃব্যাংক বাজারে প্রতি মার্কিন ডলারের দাম কমে দাঁড়িয়েছে ১২২ টাকা ৬৩ পয়সায়। একই দিনে স্পট মার্কেটে প্রতি ডলার লেনদেন হয়েছে ১২৩ টাকায়।
দুই সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। ১৫ দিন আগে স্পট মার্কেটে প্রতি ডলারের দাম ছিল ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা। অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ডলারের দাম কমেছে ৮২ পয়সা।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিভিন্ন লেনদেন এবং ঋণপত্র বা এলসি পরিশোধের ক্ষেত্রেও ডলারের দর কমেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বর্তমানে প্রতি ডলারের জন্য দিতে হচ্ছে ১২৩ টাকা ৫ পয়সা। মাসের শুরুতে একই ডলারের দর ছিল ১২৩ টাকা ৯৫ পয়সা।
সে হিসাবে আগস্টের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এ বাজারে প্রতি ডলারের দাম কমেছে ৯০ পয়সা।
ডলারের বাজারে স্বস্তি ফেরার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি আগস্টের প্রথম ১২ দিনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ১০৫ কোটি ডলার।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আগস্টের প্রথম ১২ দিনে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের জন্য এই প্রবৃদ্ধি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রবাসীদের পাঠানো ডলার ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরবরাহ বাড়ায় এবং একই সঙ্গে আমদানি দায় পরিশোধে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়ায়।
সহজভাবে বললে, বাজারে ডলারের সরবরাহ যত বাড়ে, অতিরিক্ত চাহিদার চাপ তত কমে। আর চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হলে সাধারণত মুদ্রার দামেও স্থিতিশীলতা আসে।
ডলারের দাম কমার আরেকটি কারণ হলো আমদানি ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমে আসা। কয়েক মাস আগে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও উত্তেজনার কারণে জ্বালানি, সারসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়ে গিয়েছিল।
আমদানি ব্যয় বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের ডলারের চাহিদা বাড়ে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের আমদানি দায় পরিশোধের চাপ কিছুটা কমেছে।
এর সঙ্গে রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ যোগ হওয়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ এখন তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে আগের মতো ডলার সংগ্রহের জন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাড়তি চাপ দেখা যাচ্ছে না।
তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের দাম কমলেও খোলা বাজার বা কার্ব মার্কেটে এর পুরো প্রভাব এখনো পড়েনি। রাজধানীর মতিঝিলের বিভিন্ন মানি এক্সচেঞ্জে রোববার সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি ডলার ১২৬ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ১২৬ টাকা ৭০ পয়সায় কেনা হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রাহকদের কাছে ডলার বিক্রি করা হয়েছে ১২৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১২৭ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে।
ফলে আন্তঃব্যাংক বাজারের সঙ্গে খোলা বাজারে ডলারের দামের ব্যবধান এখনো ৪ টাকার বেশি। এর অর্থ হলো, ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য ফিরলেও খোলা বাজারে ডলারের বাড়তি চাহিদা পুরোপুরি কমেনি।
এ কারণে শুধু ব্যাংকিং বাজারের দর কমেছে দেখেই বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে—এমনটা বলার সুযোগ এখনো নেই।
ডলারের দাম কমে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের আমদানি বাণিজ্যে। কারণ বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করে থাকে।
ডলারের দর কম থাকলে আমদানিকারকদের একই পরিমাণ পণ্য কিনতে তুলনামূলক কম টাকা ব্যয় করতে হতে পারে। এতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমার পাশাপাশি আমদানি-নির্ভর কিছু পণ্যের বাজারদরেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে ডলারের দাম কমলেই সঙ্গে সঙ্গে বাজারে সব পণ্যের দাম কমে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই। পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য, পরিবহন ব্যয়, শুল্ক, কর এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা-সরবরাহসহ আরও অনেক বিষয় পণ্যের চূড়ান্ত দামে প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, ডলারের বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে শুধু রেমিট্যান্স বাড়লেই হবে না। আমদানি ও রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক ডলার চাহিদার দিকেও নজর রাখতে হবে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম আবার বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সময়ও ডলারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখা গেলেও এটিকে স্থায়ী প্রবণতায় পরিণত করতে হলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, রেমিট্যান্সের বর্তমান শক্তিশালী প্রবাহ অব্যাহত থাকলে এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে আগামী দিনগুলোতে ডলারের বাজারে আরও স্থিতিশীলতা আসতে পারে।
ডলারের সরবরাহ বাড়তে থাকলে আমদানিকারকদের জন্য ডলার সংগ্রহের চাপ কমবে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর আমদানি দায় পরিশোধের সক্ষমতাও বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা কমার সুযোগ তৈরি হবে।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

