আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ আত্মগোপনের পর সম্প্রতি আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি কীভাবে বাংলাদেশ ছাড়লেন, কার সহায়তায় সীমান্ত পার হলেন এবং ভারতে পৌঁছানোর পর কোথায় ছিলেন—এসব নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর পুরো যাত্রাপথে তাঁকে মূলত তাঁর জামাই নির্দেশনা দিয়েছিলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন নানক। তিনি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিজের বিরুদ্ধে থাকা মামলার বিষয়েও কথা বলেন। সম্প্রতি তিনি আনন্দবাজারের মুখোমুখি হয়েছেন। দলটির পরবর্তী রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারে অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে নানা প্রসঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন।
নানকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত তিনি গণভবনে ছিলেন। ৪ আগস্ট দিবাগত রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে থাকার পর পরদিন পরিস্থিতি বদলে যায়।
তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর একের পর এক আশ্রয়স্থল পরিবর্তন করতে থাকেন। নিরাপত্তার কারণে যেসব ফোন ব্যবহার করতেন, সেগুলোও ফেলে দেন। একপর্যায়ে তাঁর মনে হয়, তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান আরও জোরদার হতে পারে। তখনই তিনি দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় তাঁর জামাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে জানান নানক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর জামাই একজন চিকিৎসক। তিনি ফোন করে নানককে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেন এবং কীভাবে বের হতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
নানকের ভাষায়, তাঁর জামাইয়ের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করেই তিনি সীমান্তের দিকে এগিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত ১৬ আগস্ট তিনি ভারতীয় ভূখণ্ডে পৌঁছান বলে সাক্ষাৎকারে জানান।
তাঁর এই বক্তব্যে দেশ ছাড়ার পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা পরিকল্পিত ছিল, সেই বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে সীমান্তের ঠিক কোন স্থান দিয়ে তিনি প্রবেশ করেছিলেন, সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত জানাননি।
ভারতে প্রবেশের পর সরাসরি কলকাতায় যাননি নানক। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ১৬ আগস্ট প্রথমে শিলংয়ে পৌঁছান। সেখান থেকে যান মালদহে।
মালদহে তাঁর মেয়ে ও নাতি-নাতনিরা আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। এরপর পরের দিন কলকাতায় চলে যান। অর্থাৎ বাংলাদেশ ছাড়ার পর তাঁর যাত্রাপথ ছিল শিলং থেকে মালদহ এবং সেখান থেকে কলকাতা।
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, ভারতে পৌঁছানোর পরও তিনি সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ীভাবে অবস্থান না করে পরিবারের সদস্যদের কাছে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন।
নানক জানান, পরিস্থিতি বিবেচনা করে একসময় তিনি বুঝতে পারেন, দেশে থাকা তাঁর জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থেকেই দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
এর আগে বেশ কয়েকটি জায়গায় আশ্রয় পরিবর্তন এবং যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ফোন ফেলে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এরপর সিদ্ধান্ত নেন, তাঁকে দেশ ছাড়তেই হবে।
নানকের দাবি, তাঁর দেশ ছাড়ার প্রক্রিয়াটি তাঁর জামাইয়ের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
সাক্ষাৎকারে নানক জানান, ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে। শেখ হাসিনার শারীরিক অবস্থার বিষয়েও প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তিনি ভালো আছেন।
নানকের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনেও তাঁর যোগাযোগ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা নিজের শারীরিক অবস্থা নিয়ে তাঁকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার কথা বলেছেন।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান নিয়ে ভারতের ভূমিকা সম্পর্কেও নানক নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। তাঁর দাবি, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় শেখ হাসিনাকে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা ভূমিকা রেখেছিলেন।
কলকাতায় আওয়ামী লীগের কোনও অফিস রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নেরও মুখোমুখি হন নানক। তিনি দাবি করেন, কলকাতায় দলের কোনও অফিস নেই।
তবে তাঁর বক্তব্য, কেউ যদি তাঁদের বসার জন্য জায়গা দেন, তাহলে তাঁরা সেখানে যেতে পারেন। কিন্তু সেটিকে আওয়ামী লীগের অফিস বলা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, কলকাতায় থেকেও নিজের এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন বলে জানান নানক। বিশেষ করে গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়া এবং তাঁদের পাশে থাকার কথাও বলেন তিনি।
জুলাই আন্দোলন ঘিরে মোহাম্মদপুরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিজের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ নিয়েও কথা বলেছেন নানক। সাক্ষাৎকারে তাঁকে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে এবং কয়েকজনের হত্যার অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত।
জবাবে নানক বলেন, তিনি কৌশলগতভাবে আইনি লড়াই করছেন। তাঁর দাবি, মামলার নথিতে তাঁর নির্দেশের কথা উল্লেখ থাকলেও তাঁকে ঘটনাস্থলে দেখেছেন—এমন কোনও সাক্ষীর বক্তব্য নেই। তিনি নিজে অস্ত্র হাতে সেখানে গিয়ে গুলি করেছেন কি না, এমন প্রমাণও দাবি করেন তিনি।
এগুলো নানকের নিজের বক্তব্য; অভিযোগগুলোর সত্যতা বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে এগুলোকে দেখা উচিত নয়।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্য দিয়েছেন নানক। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও রয়েছে এবং দলকে পুরোপুরি শেষ করে দেওয়া সম্ভব নয়।
ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় দলটির সাংগঠনিক শক্তির কথাও সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পরিস্থিতিতে সংঘাত আরও বাড়লে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল। তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা রক্তপাত চাননি বলেই সংঘাতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তিনিও ফিরবেন কি না, এমন প্রশ্ন করা হয় নানককে। জবাবে তিনি জানান, শেখ হাসিনার আগেই তাঁরা দেশে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন।
তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁরা অবশ্যই ফিরবেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার তাঁকে দেখা যাবে কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে নানক বলেন, বেঁচে থাকলে তাঁকে আবার রাজনীতির মাঠে দেখা যাবে।
জাহাঙ্গীর কবির নানকের সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো তাঁর দেশ ছাড়ার বর্ণনা। ৫ আগস্টের পর আত্মগোপনে থাকা, একাধিক জায়গায় আশ্রয় পরিবর্তন, যোগাযোগের ফোন ফেলে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত জামাইয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করে দেশ ছাড়ার কথা তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
১৬ আগস্ট শিলংয়ে পৌঁছানোর পর মালদহ হয়ে পরদিন কলকাতায় যাওয়ার কথাও স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন তিনি।
তবে তাঁর এই বক্তব্যের বাইরে সীমান্ত পার হওয়ার নির্দিষ্ট স্থান বা সেই যাত্রায় অন্য কারা সহযোগিতা করেছিলেন, সে বিষয়ে সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই এসব বিষয়ে অতিরিক্ত কোনও দাবি করার সুযোগ নেই।
বর্তমানে নানকের বক্তব্য ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নেতাদের দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আইনি প্রক্রিয়াও রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা।

