সীমান্ত অনুপ্রবেশ ব্যবসার অন্তরালের বাস্তবতা: এক দালালের স্বীকারোক্তি
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ও অবৈধ অনুপ্রবেশের প্রশ্নে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর এলাকার এক প্রাক্তন দালালের বয়ানে উঠে এসেছে সীমান্ত ঘিরে গড়ে ওঠা বহু কোটি টাকার অনুপ্রবেশ ব্যবসার চাঞ্চল্যকর চিত্র। তাঁর দাবি অনুযায়ী, প্রশাসনিক কড়াকড়ি এবং নতুন প্রক্রিয়া চালুর পর এই অবৈধ ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বহু মানুষ বিকল্প জীবিকার সন্ধান করতে বাধ্য হয়েছেন।
‘ধুড় পারাপার’: সীমান্ত পেরোনোর সংগঠিত অবৈধ নেটওয়ার্ক
স্বরূপনগরের বাসিন্দা সিরাজুল (ছদ্মনাম) দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে যে কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, স্থানীয় ভাষায় সেটি পরিচিত ছিল ‘ধুড় পারাপার’ নামে। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের অবৈধভাবে ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশে সহায়তা করা।
সীমান্ত সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ‘ঘাট’। এগুলো ছিল এমন স্থান, যেখানে নজরদারির ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের সীমান্ত অতিক্রম করানো হতো। সিরাজুলের মতে, কোন সময়ে কোন ঘাট তুলনামূলক নিরাপদ থাকবে, সে তথ্য মূলত বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই সরবরাহ করা হতো।
কীভাবে পরিচালিত হতো অনুপ্রবেশের পুরো প্রক্রিয়া?
এই অবৈধ নেটওয়ার্ক ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত। সীমান্তের দুই পাশেই কাজ করত পৃথক দল। বাংলাদেশের অংশে থাকা দালালরা সম্ভাব্য অনুপ্রবেশকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করত এবং পারাপারের পরিকল্পনা করত।
ভারতীয় সীমান্তের কাছে অবস্থান করতেন তথাকথিত ‘লাইনম্যানরা’। তাঁদের দায়িত্ব ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর টহলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং সুযোগের মুহূর্ত সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দেওয়া। উপযুক্ত সময় নির্ধারণ হওয়ার পর সীমান্ত অতিক্রমের কাজ সম্পন্ন করা হতো।
শুধু রাত নয়, দিনের বিভিন্ন সময়েও সুযোগ বুঝে এই কার্যক্রম চালানো হতো বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: সীমান্ত অপরাধে ডিজিটাল যোগাযোগ
সিরাজুলের দাবি অনুযায়ী, দুই দেশের দালাল চক্রের মধ্যে যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হতো। অনেকের কাছেই দুই দেশের সিমকার্ড থাকত, ফলে সীমান্তের উভয় প্রান্তের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ সম্ভব হতো।
টাকা লেনদেনেও ব্যবহার করা হতো ডিজিটাল পদ্ধতি। মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্ত পেরোনোর পর কী হতো?
অনুপ্রবেশকারীরা সীমান্ত অতিক্রম করার পর দায়িত্ব নিত ভারতীয় অংশের দালাল চক্র। তাঁদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া, বাসস্ট্যান্ড বা রেলস্টেশনে নিয়ে যাওয়া এবং বড় শহরের দিকে যাত্রার ব্যবস্থা করা হতো।
অনেক ক্ষেত্রে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি পুরো যাত্রাপথে সঙ্গে থাকতেন, যাতে নতুন পরিবেশে কোনো সমস্যা না হয়। কলকাতার মতো বড় শহরে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়েই দালালদের দায়িত্ব শেষ হতো।
কোটি টাকার অনুপ্রবেশ ব্যবসা: কত ছিল আর্থিক লেনদেন?
এই অবৈধ ব্যবসার অর্থনৈতিক পরিসর ছিল বিশাল। সিরাজুলের দাবি অনুযায়ী, সীমান্তের নির্দিষ্ট কয়েকটি ঘাট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক ডজন মানুষ প্রবেশ করত।
একটি ঘাট থেকে মাসিক আয় কয়েক লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারত। বিভিন্ন ব্যয় ও ঝুঁকি সত্ত্বেও এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকায় শত শত ঘাট সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে বনগাঁ, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ অঞ্চলে অনুপ্রবেশের হার তুলনামূলক বেশি ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বার্ষিক আর্থিক লেনদেন কয়েকশো কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছিল বলে দাবি উঠেছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
অনুপ্রবেশের ঘটনায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সিরাজুলের দাবি, অতীতে বিভিন্ন স্তরে অনিয়মের সুযোগ থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কড়াকড়ি বৃদ্ধি পাওয়ায় অবৈধ অনুপ্রবেশের পথ আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে পুরনো দালাল চক্রের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তবে এই ধরনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং স্বাধীন তদন্তের গুরুত্ব অপরিসীম।
ভুয়ো নথিপত্র তৈরির অভিযোগ: অনুপ্রবেশের আরেক দিক
সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করাই ছিল না এই চক্রের শেষ ধাপ। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য প্রয়োজন হতো বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও সরকারি নথির।
অভিযোগ রয়েছে, অসাধু ব্যক্তি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তায় জন্মসনদ, বাসিন্দা শংসাপত্রসহ বিভিন্ন নথি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হতো। এসব নথি ব্যবহার করে পরবর্তীতে অন্যান্য সরকারি পরিচয়পত্র সংগ্রহের চেষ্টা চালানো হতো।
এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রশাসনিক দুর্নীতি ও সীমান্ত অপরাধের যোগসূত্র
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত অপরাধ শুধুমাত্র দালাল চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। এর সঙ্গে যদি প্রশাসনিক দুর্নীতি যুক্ত হয়, তাহলে সমস্যার গভীরতা আরও বেড়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি ব্যক্তিগত লাভের আশায় অবৈধ কার্যকলাপে সহযোগিতা করেছেন। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।
কড়াকড়ি বৃদ্ধির ফলে থমকে গেছে অবৈধ ব্যবসা
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত নজরদারি জোরদার হওয়া, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে এই ব্যবসায় বড় ধাক্কা লেগেছে বলে দাবি করেছেন প্রাক্তন দালালরা।
অনেকেই এখন বিকল্প পেশায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর উপরও এর প্রভাব পড়েছে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অবৈধ অনুপ্রবেশ চক্র শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সীমান্ত অঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দালাল চক্রের অভিযোগ ও স্বীকারোক্তি পরিস্থিতির একটি দিক তুলে ধরলেও, প্রতিটি দাবির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা, প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই এই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে পুনর্লিখিত।

