বিশ্ব অর্থনীতির নানা অনিশ্চয়তা, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার সংক্রান্ত প্রত্যাশার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারেও। ঈদ-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) স্বর্ণের দাম কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, যা ক্রেতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে।
বিশ্ববাজারে কেন কমছে স্বর্ণের দাম?
শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য নিম্নমুখী প্রবণতা দেখিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার আরও বাড়তে পারে—এমন ধারণাও স্বর্ণের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
স্পট গোল্ডের মূল্য ০.৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,৪৫২.২০ ডলারে নেমে এসেছে। সপ্তাহজুড়ে এই পতনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৮ শতাংশ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগস্ট ডেলিভারির স্বর্ণ ফিউচার ০.৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪,৪৭৮.৫০ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি সাধারণত স্বর্ণের চাহিদা বাড়ালেও বর্তমানে সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণ থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা কেন স্বর্ণের জন্য নেতিবাচক?
স্বর্ণকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ বিনিয়োগের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি বা অর্থনৈতিক সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণে অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন।
তবে স্বর্ণ একটি সুদবিহীন সম্পদ। ফলে যখন ব্যাংক সুদের হার বৃদ্ধি পায় বা সুদের হার আরও বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন বিনিয়োগকারীরা স্বর্ণের পরিবর্তে সুদ প্রদানকারী সম্পদের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এর ফলে স্বর্ণের চাহিদা এবং দাম উভয়ই কমতে শুরু করে।
বাজার পর্যবেক্ষকদের মতে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন সম্ভাবনা এখনো উল্লেখযোগ্য। তাই বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের দিকে, যা ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও পতন
শুধু স্বর্ণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।
রুপার দাম ১.৪ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৭২.৮৯ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে প্লাটিনামের মূল্য ১.১ শতাংশ কমে ১,৮৭৮.৬৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে প্যালাডিয়ামের দাম ১.৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১,২৯৮.৪৫ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
ফলে সপ্তাহের শেষে প্রায় সব ধরনের মূল্যবান ধাতুই ক্ষতির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ধাতব বাজারে সামগ্রিকভাবে দরপতনের প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে।
বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে স্বস্তি
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমার প্রভাব দেশের বাজারেও পড়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন করে স্বর্ণের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমানো হয়েছে।
বাজুস জানিয়েছে, স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণ বা পিওর গোল্ডের দাম কমে যাওয়ায় নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সার্বিক বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম কত?
নতুন ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী দেশের বাজারে ২২ ক্যারেটের এক ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৫৫ টাকা।
এছাড়া অন্যান্য ক্যাটাগরির স্বর্ণের দাম হলো—
২২ ক্যারেট স্বর্ণ
প্রতি ভরি: ২,৩৪,৮৫৫ টাকা
২১ ক্যারেট স্বর্ণ
প্রতি ভরি: ২,২৪,১৮২ টাকা
১৮ ক্যারেট স্বর্ণ
প্রতি ভরি: ১,৯২,১৬৪ টাকা
সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ
প্রতি ভরি: ১,৫৬,৪৭৩ টাকা
এই নতুন মূল্য দেশের সব জুয়েলারি দোকানে কার্যকর হয়েছে এবং ক্রেতারা এখন কম দামে স্বর্ণ কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।
সামনে স্বর্ণের বাজার কোন দিকে যেতে পারে?
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের ভবিষ্যৎ মূল্য অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। যদি সুদের হার বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে, তাহলে স্বর্ণের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে নতুন কোনো বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা আবারও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের বাজারেও আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে স্বর্ণের মূল্য ওঠানামা করতে পারে। তাই যারা স্বর্ণে বিনিয়োগ করতে চান বা গয়না কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের বাজারেও স্বর্ণের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি ভরিতে ৩,২৬৬ টাকা কমায় ক্রেতারা কিছুটা স্বস্তি পেলেও ভবিষ্যৎ বাজার পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। বৈশ্বিক অর্থনীতি, সুদের হার এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ আগামী দিনে স্বর্ণের দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

