গ্রীষ্মের তীব্রতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিশ্বজুড়ে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তাপপ্রবাহ এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি উত্তরপ্রদেশে টানা পাঁচ দিন তীব্র তাপপ্রবাহ বজায় থাকে, তাহলে প্রায় ৮ হাজার ৫৬ জন মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। এই সম্ভাব্য পরিসংখ্যান ইতিমধ্যেই প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
উত্তরপ্রদেশে কেন এত বড় মৃত্যুঝুঁকি?
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তরপ্রদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জনঘনত্ব এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামোর চাপের কারণে বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহের সময় এই রাজ্যের বিপুল জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। বয়স্ক মানুষ, শিশু, শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
২০২৪ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেই এই সম্ভাব্য মৃত্যুর হিসাব তৈরি করা হয়েছে। ওই সময়ে তাপমাত্রা বহু বছরের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল। শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেও অস্বাভাবিক গরমের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়েছিল। সেই তথ্য ও বর্তমান জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় নিয়ে গবেষকরা এই পূর্বাভাস দিয়েছেন।
বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও রাজস্থানেও বাড়ছে শঙ্কা
শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, ভারতের আরও কয়েকটি রাজ্য তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সমীক্ষা অনুযায়ী, বিহারে সম্ভাব্য মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৬১৫ জন হতে পারে। একইভাবে মধ্যপ্রদেশে প্রায় ২ হাজার ৯৬৪ জন এবং রাজস্থানে প্রায় ২ হাজার ৬৬৪ জন মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই পরিসংখ্যান নির্ধারণে অতীতের তাপপ্রবাহজনিত মৃত্যুর তথ্য, জনসংখ্যার ঘনত্ব, আবহাওয়ার প্রবণতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ফলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
গোটা দেশে ৩০ হাজার মৃত্যুর আশঙ্কা
গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ভারতজুড়ে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। এই সম্ভাব্য মৃত্যুর বড় অংশই উত্তরপ্রদেশ থেকে আসতে পারে, কারণ রাজ্যটির জনসংখ্যা অত্যন্ত বেশি এবং বহু মানুষ খোলা পরিবেশে কাজ করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শহর ও গ্রামের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সীমিত প্রস্তুতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ফলে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সমীক্ষা মূলত শহরাঞ্চলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী গ্রামে বসবাস করে, যেখানে তাপপ্রবাহের প্রভাব আরও মারাত্মক হতে পারে।
গ্রামীণ এলাকার কৃষক, দিনমজুর এবং নির্মাণশ্রমিকদের অনেক সময় প্রখর রোদের নিচে দীর্ঘক্ষণ কাজ করতে হয়। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানীয় জল, শীতল আশ্রয় বা স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার অভাব তাদের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে বাস্তব পরিস্থিতিতে মৃত্যুর সংখ্যা অনুমানের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপপ্রবাহের বাড়তি ঝুঁকি
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপপ্রবাহের ঘটনা আগের তুলনায় অনেক বেশি ঘনঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘ সময় ধরে তাপপ্রবাহ চলতে পারে। এর ফলে কৃষি, জনস্বাস্থ্য, পানি সরবরাহ এবং অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভারতের মতো জনবহুল দেশে এই সংকট মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা তৈরির ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জরুরি প্রস্তুতির আহ্বান
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও অতিরিক্ত গরমের সময় সতর্ক থাকতে হবে, পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং অপ্রয়োজনে রোদে বের হওয়া এড়িয়ে চলতে হবে।
উত্তরপ্রদেশসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে তাপপ্রবাহের সম্ভাব্য ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, তা জলবায়ু সংকটের বাস্তব চিত্রই তুলে ধরছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ না করলে আগামী বছরগুলোতে তাপপ্রবাহ আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

