২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেনের শিরোপা জয়ের আনন্দে যখন পুরো ফুটবল বিশ্ব মেতে উঠেছে, তখন মাঠের ভেতরে আরেকটি দৃশ্য কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালের তিন বছরের সৎ ভাই কেইনে আবারও হয়ে উঠেছেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বকাপজুড়ে তার নিষ্পাপ হাসি, দুষ্টুমি আর ভাইয়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারানোর পর মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ভাইয়ের সঙ্গে তার আবেগঘন মুহূর্ত মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ফাইনাল জয়ের বাঁশি বাজতেই স্পেনের খেলোয়াড়রা উদযাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ঠিক সেই সময় গ্যালারি থেকে ছোট্ট কেইনে মাঠে নেমে সরাসরি বড় ভাই লামিনে ইয়ামালের দিকে দৌড়ে যায়।
স্পেনের জার্সির প্রতিরূপ পরে, পেছনে ভাইয়ের ১৯ নম্বর এবং নিজের নাম লেখা সেই ছোট্ট জার্সিতে কেইনেকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ইয়ামাল। তিনি ছোট ভাইকে জড়িয়ে ধরেন, কোলে তুলে নেন এবং আনন্দে আকাশে উঁচু করে তুলে আবার মাটিতে নামিয়ে দেন। এরপর নিজের লাল রঙের ‘Lamine’ লেখা ক্যাপটি ভাইয়ের মাথায় পরিয়ে দেন। এই দৃশ্যই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মন জয় করে নেয়।
মাঠে আনন্দ করতে করতেই আরেকটি মজার ঘটনা ঘটে। নিউ জার্সি স্টেট ট্রুপারের এক কর্মকর্তা নিজের ক্যাপ খুলে ছোট্ট কেইনের মাথায় পরিয়ে দেন। কেইনে কয়েক মুহূর্ত সেই টুপি পরে আনন্দে ঘুরে বেড়ায় এবং পরে ভদ্রভাবে সেটি ফিরিয়ে দেয়।
এই ছোট্ট ঘটনাও ক্যামেরায় ধরা পড়ে এবং অল্প সময়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। দর্শকরা মন্তব্য করেন, বিশ্বকাপে ট্রফির পাশাপাশি কেইনেও যেন আলাদা এক আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
এবারের বিশ্বকাপে কেইনের উপস্থিতি নতুন কিছু নয়। স্পেনের প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় তাকে দেখা গেছে। কখনও হাসতে, কখনও দর্শকদের দিকে হাত নাড়তে, আবার কখনও ভাইকে উৎসাহ দিতে ব্যস্ত ছিল সে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম কেইনেকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। কেউ তাকে বলেছেন ‘২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশু’, কেউ আবার ‘স্টেডিয়ামের আসল সুপারস্টার’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন।
বিশেষ করে বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচের পর তার জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়।
কোয়ার্টার ফাইনালে টেলিভিশনের ক্যামেরা যখন গ্যালারিতে থাকা কেইনের দিকে ঘুরে যায়, তখন সে বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে মজার ভঙ্গি করে।
স্টেডিয়ামের বিশাল স্ক্রিনে সেই দৃশ্য দেখেই মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে হেসে ফেলেন ইয়ামাল। পরে সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানান, আগের দিনই ছোট ভাই তাকে ফোন করে বলেছিল যে পরদিন ম্যাচে সে এমন দুষ্টুমি করবে।
ইয়ামালের ভাষায়, ছোট ভাই মায়ের ফোন থেকে তাকে কল করে আগেই জানিয়েছিল যে সে বড় পর্দায় জিভ বের করবে। তাই স্ক্রিনে সেই দৃশ্য দেখেই তার হাসি থামছিল না।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জন্ম নেওয়া কেইনে ইয়ামালের মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। যদিও দুই ভাইয়ের বাবা আলাদা, তবুও তাদের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ম্যাচসেরা হওয়ার পর ইয়ামাল ছোট ভাইকে নিয়ে আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বলেন, ছোট ভাইকে এত আনন্দে দেখতে পারাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় সুখ।
তার কথায়, কেইনে তার কাছে সবকিছু। এমনকি অনেক সময় তার মনে হয়, ছোট ভাই যেন নিজের সন্তানের মতো।
যারা দীর্ঘদিন ধরে ইয়ামালকে অনুসরণ করছেন, তাদের কাছে কেইনে মোটেও নতুন মুখ নয়।
দুই ভাইকে একসঙ্গে টিকটক ভিডিও বানাতে প্রায়ই দেখা যায়। গত মৌসুমে বার্সেলোনার লা লিগা শিরোপা উদযাপনের সময় মাঠে দুই ভাইয়ের ফুটবল খেলার ভিডিওও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল।
এছাড়া কেইনের বার্সেলোনার সংগীত গাওয়া, ভাইয়ের নাম ধরে চিৎকার করা কিংবা বার্সেলোনার বিখ্যাত মাসকট ‘ক্যাট’-এর সঙ্গে খেলাধুলার ভিডিওও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্পেন দলের আরেক তারকা নিকো উইলিয়ামসের সঙ্গেও কেইনের দারুণ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। ম্যাচের আগে অনুশীলনের সময় নিকোর বিপক্ষে ছোট্ট একটি গোলও করেছিল সে, যা দর্শকদের বেশ আনন্দ দিয়েছিল।
আজ বিশ্বজুড়ে তারকা হলেও নিজের অতীত কখনও ভুলে যান না লামিনে ইয়ামাল।
স্পেনের কাতালোনিয়ার দরিদ্র এলাকা রোকাফোন্দায় তার বেড়ে ওঠা। তার বিখ্যাত ‘৩০৪’ উদযাপন সেই এলাকার পোস্টকোডের প্রতীক, যা নিজের শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
ইয়ামাল এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তার মা মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাকে জন্ম দিয়েছিলেন। পরিবার চালাতে তার বাবাকে রাস্তায় পরিশ্রম করতে হয়েছে। সেই কঠিন বাস্তবতার তুলনায় ফুটবল খেলা অনেক সহজ বলেই মনে করেন তিনি।
আরেকটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ছোটবেলায় এমন একটি ছোট্ট বাসায় থাকতেন যেখানে রান্নাঘর ও শোবার ঘর প্রায় একই জায়গায় ছিল। এখন তিনি সবচেয়ে বেশি খুশি হন যখন দেখেন, তার ছোট ভাই সেই কষ্টের জীবন পাড়ি দিতে হচ্ছে না।
লামিনে ইয়ামালের শৈশবের একটি ছবি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ছবিতে পরিণত হয়েছে।
২০০৭ সালে একটি দাতব্য ফটোশুটে পাঁচ মাস বয়সী ইয়ামালকে কোলে নিয়েছিলেন তৎকালীন বার্সেলোনা তারকা লিওনেল মেসি। ছবিতে দেখা যায়, মেসি ছোট্ট ইয়ামালকে গোসল করিয়ে তোয়ালে জড়িয়ে কোলে তুলে রেখেছেন।
বহু বছর পর সেই ছবিই নতুন করে আলোচনায় আসে, যখন ইয়ামাল নিজেই বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকায় পরিণত হন। ফাইনালে দুই প্রজন্মের দুই কিংবদন্তির মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও ছবিটিকে আরও ঐতিহাসিক করে তুলেছে।
কেইনে শুধু মাঠেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমান জনপ্রিয়।
তার মা শেইলা এবানার ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে নিয়মিতই ছোট্ট কেইনের ছবি ও ভিডিও প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন পারিবারিক মুহূর্ত, বেড়ানো কিংবা রেস্তোরাঁয় কাটানো সময়ের ছবিও ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এই জনপ্রিয়তার কারণে অনেকেই মনে করছেন, ভবিষ্যতে ফুটবলের বাইরেও কেইনে নিজস্ব পরিচয়ে একজন তারকায় পরিণত হতে পারে।
২০২৬ বিশ্বকাপে অসংখ্য স্মরণীয় গোল, নাটকীয় ম্যাচ এবং নতুন রেকর্ডের জন্ম হয়েছে। তবে সব কিছুর মাঝেও ছোট্ট কেইনে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নিয়ে এসেছে এক অন্যরকম আবেগের গল্প।
বড় ভাইয়ের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, শিশুসুলভ সরলতা এবং আনন্দে ভরা প্রতিটি মুহূর্ত কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছে। লামিনে ইয়ামাল যেমন স্পেনকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে ইতিহাস গড়েছেন, তেমনি তার তিন বছরের ভাই কেইনে নিজের নিষ্পাপ হাসি আর প্রাণবন্ত উপস্থিতি দিয়ে হয়ে উঠেছেন টুর্নামেন্টের অন্যতম স্মরণীয় মুখ।
ফুটবল ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত রয়েছে, যা শুধু খেলার জন্য নয়, মানবিক অনুভূতির জন্যও চিরকাল মনে রাখা হয়। লামিনে ইয়ামাল ও ছোট্ট কেইনের এই ভাইয়ের ভালোবাসার গল্পও নিঃসন্দেহে সেই তালিকায় বিশেষ স্থান করে নেবে।

