ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। নর্থ সি বা উত্তর সাগরে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বার্নহ্যামের সম্ভাব্য জ্বালানি নীতির প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে লেবার পার্টির শীর্ষ নেতারাই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত অবস্থান থেকে সরকার সরে আসবে না। ফলে ক্ষমতার শুরুতেই জ্বালানি নীতি নিয়ে বিভক্তির ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ক্ষমতায় এসেই অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে এমন এক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা ব্রিটেনের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং পরিবেশনীতি—তিনটির সঙ্গেই জড়িত। উত্তর সাগরে নতুন তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লাইসেন্স দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক টানাপোড়েন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, বার্নহ্যাম উত্তর সাগরের জ্বালানি সম্পদ পুরোপুরি ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছেন। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ব্রিটেন আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারবে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল যে নতুন সরকার উত্তর সাগরের তেল ও গ্যাস উত্তোলনে নতুন গতি আনতে পারে। তিনি আরও বলেন, স্কটল্যান্ডের অ্যাবারডিন অঞ্চলের মানুষ এই সম্ভাবনায় উচ্ছ্বসিত, কারণ ওই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটেনের তেল শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
ট্রাম্পের ভাষায়, উত্তর সাগরের সম্পদ পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং অতিরিক্ত বায়ু টারবাইনের ওপর নির্ভরতা কমানো ব্রিটেনের অর্থনীতির জন্য বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরই লেবার পার্টির ডেপুটি নেতা লুসি পাওয়েল স্পষ্ট করে জানান, দল নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি থেকেই পরিচালিত হবে। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
লেবার নেতৃত্বের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দেশীয় নবায়নযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো। তাদের দাবি, এতে বিদ্যুতের দামও কমবে এবং বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস পাবে।
অন্যদিকে সরকারের ভেতরের কিছু মহল মনে করে, দেশীয় তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়ালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কর আদায় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার প্রভাব কমবে।
বর্তমানে রোজব্যাঙ্ক এবং জ্যাকড’ তেল-গ্যাস ক্ষেত্রের লাইসেন্স থাকলেও সেগুলোর পূর্ণ অনুমোদন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম চাইলে এই প্রকল্পগুলোতে অনুমোদন দিতে পারেন।
তবে নতুন অনুসন্ধানের লাইসেন্স নিষিদ্ধ রাখলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের সঙ্গে নীতিগত মতবিরোধ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি ব্যাডেনক বার্নহ্যামকে উত্তর সাগরে নতুন তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, নতুন লাইসেন্স বন্ধ রাখা মানে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে দুর্বল করা।
তিনি বলেন, দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো শুধু বিদ্যুতের খরচ কমাবে না, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও শক্তিশালী করবে।
অন্যদিকে রিফর্ম ইউকের এমপি রিচার্ড টাইসও একই সুরে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, দেশের মাটির নিচে থাকা জ্বালানি সম্পদের যথাযথ ব্যবহারই ব্রিটেনকে প্রকৃত অর্থে জ্বালানি স্বাধীনতা এনে দিতে পারে।
বাকিংহাম প্যালেসে রাজার সঙ্গে সাক্ষাতের পর অ্যান্ডি বার্নহ্যাম আনুষ্ঠানিকভাবে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করবেন। সেখানে তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে ব্রিটেনকে আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করবেন বলে জানা গেছে।
তিনি লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ বিভাজন কাটিয়ে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতিও দিতে পারেন। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলাকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরবেন।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, ক্ষমতায় এসেই বার্নহ্যাম প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি ঘোষণা করতে পারেন। এর মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের হাতে আরও ক্ষমতা হস্তান্তর, থেমস ওয়াটারের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং বিতর্কিত ডিজিটাল আইডি প্রকল্প বাতিলের মতো উদ্যোগ থাকতে পারে।
এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি আগের সরকারের বিতর্কিত নীতিগুলো থেকে নিজেকে আলাদা করে তুলে ধরতে চাইছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার পর লেবার পার্টির জনপ্রিয়তায় কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি জনমত জরিপে দলটি রিফর্ম ইউকের সঙ্গে সমান অবস্থানে পৌঁছেছে। একই সময়ে নাইজেল ফারাজের দলের জনপ্রিয়তা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে।
এ কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা “বার্নহ্যাম বাউন্স” নামে নতুন একটি প্রবণতার কথাও উল্লেখ করছেন।
যদিও লেবার সমর্থকদের মধ্যে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আশাবাদ দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দলগুলো এখনই আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে।
রিফর্ম ইউকের রবার্ট জেনরিক অভিযোগ করেছেন, বার্নহ্যামের সুস্পষ্ট নীতিগত পরিকল্পনা নেই এবং তিনি বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থান বদল করে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
প্রায় নয় বছর ওয়েস্টমিনস্টারের বাইরে থাকার পর এক মাস আগে মেকারফিল্ড আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে ফিরে আসেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। পরে স্যার কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর ৩৭৯ জন লেবার এমপির সমর্থনে তিনি দলীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
এই সমর্থন তাঁকে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।
এদিকে ব্রিটেনের নেট জিরো কর্মসূচি নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। জানা গেছে, আগামী বছরের শেষ নাগাদ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন হলে দূর থেকে হিট পাম্পের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
সরকারের জ্বালানি নিরাপত্তা ও নেট জিরো বিভাগ বলছে, বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালে এই ব্যবস্থা বিদ্যুৎ গ্রিডের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে এবং বড় ধরনের ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি কমাবে।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, শীতকালে এটি সাধারণ মানুষের জ্বালানি ব্যবহারে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।
অ্যান্ডি বার্নহ্যামের প্রধানমন্ত্রীত্বের সূচনাই প্রমাণ করে দিয়েছে, সামনে তাঁর জন্য সহজ পথ অপেক্ষা করছে না। উত্তর সাগরের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—সবকিছুই এখন একই সঙ্গে তাঁর নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে ব্রিটেন জ্বালানি নীতিতে নতুন পথে হাঁটবে, নাকি পূর্বঘোষিত পরিবেশবান্ধব কৌশলেই অটল থাকবে।

