খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeটকিং পয়েন্টবিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনা: শৈশবের স্মৃতি, পরিবার আর আবেগে গাঁথা এক বাঙালির গল্প

বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনা: শৈশবের স্মৃতি, পরিবার আর আবেগে গাঁথা এক বাঙালির গল্প

এখন কাজের চাপ বেড়েছে। শুটিং, ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে আর আগের মতো রাত জেগে সব ম্যাচ দেখা হয় না। তবুও চেষ্টা করি অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো দেখার। সাড়ে ন’টা বা এগারোটার ম্যাচগুলো মিস করি না।

ফুটবলটা আমার কাছে শুধু একটা খেলা না, এটা যেন রক্তের ভেতর মিশে থাকা একটা অনুভূতি। ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি, আমি যখন মায়ের পেটে, তখনও নাকি আমাদের বাড়িতে বিশ্বকাপ নিয়ে উত্তেজনার শেষ ছিল না। মা নিজেই বলতেন, রাত জেগে খেলা দেখতেন আর ঠাকুমা তাকে ঘুমোতে যেতে বলতেন। কিন্তু সেই টান, সেই আবেগ—সেটা থামানো যায়নি।

এই গল্পগুলো শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি। মনে হয়েছে, ফুটবলটা যেন জন্মের আগেই আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

আমাদের বাড়িতে ফুটবল মানে একটা পারিবারিক উৎসব। বাবা আর দাদু—দু’জনেই খেলতেন। তাই খেলার প্রতি ভালোবাসাটা একদম স্বাভাবিকভাবেই চলে এসেছে। বাবার কাছে ‘মি-টাইম’ মানে আজও টিভি বা ডেস্কটপের সামনে বসে খেলা দেখা। যদিও এখন আর মাঠে নামা হয় না, কিন্তু খেলার প্রতি তার টান একটুও কমেনি।

ছোটবেলায় একটা মজার অভ্যাস ছিল। কোনদিন কোন দলের খেলা—সেটা নিয়ে আমরা একটা চার্ট বানাতাম। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হত। মনে হতো যেন আমরা নিজেরাই দলের অংশ।

আমাদের পরিবারে ফুটবল মানেই একটু প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দাদু ছিলেন আর্জেন্টিনার সমর্থক। আর আমি আর বাবা—আমরা ব্রাজিলের অন্ধভক্ত। এই নিয়ে কত তর্ক, কত খুনসুটি—তার হিসেব নেই।

খেলার সময় আমরা কিন্তু সেটা খুব সিরিয়াসলি নিতাম। কেউ হারলে মন খারাপ, কেউ জিতলে আনন্দে লাফালাফি—সব মিলিয়ে পুরো আবেগের রোলারকোস্টার। দাদু যখন ছিলেন, তখন রাত জেগে একসঙ্গে খেলা দেখা ছিল আমাদের নিয়ম। সঙ্গে বিস্কুট, চানাচুর, নানা রকম স্ন্যাক্স—সব মিলিয়ে একেবারে উৎসবের আমেজ।

আজও সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে মনটা নরম হয়ে যায়।

বিশ্বকাপ এলেই যেন সময়টা একটু আলাদা হয়ে যায়। রাত জেগে খেলা দেখা, সকালে চোখ লাল হয়ে থাকা—এসব ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু সেই ক্লান্তির মধ্যেও একটা অদ্ভুত আনন্দ ছিল।

এখন কাজের চাপ বেড়েছে। শুটিং, ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে আর আগের মতো রাত জেগে সব ম্যাচ দেখা হয় না। তবুও চেষ্টা করি অন্তত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো দেখার। সাড়ে ন’টা বা এগারোটার ম্যাচগুলো মিস করি না।

তবে আগের মতো পুরোটা দেখা না হলেও, শুটিংয়ের ফাঁকে হাইলাইটস দেখে নিই। কারণ ফুটবলটা আমার কাছে এখনও ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকেই জিজ্ঞেস করে, ফুটবলের মধ্যে এমন কী আছে? আমার কাছে উত্তরটা খুব সহজ।

এই খেলাটা ৯০ মিনিটের একটানা উত্তেজনা। এখানে এক মুহূর্তেই সব বদলে যেতে পারে। একটা গোল, একটা ভুল, একটা সিদ্ধান্ত—সবকিছু উল্টে দিতে পারে ম্যাচের ফল।

এই ‘ডু অর ডাই’ অনুভূতিটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। শেষ বাঁশি বাজার আগে কিছুই নিশ্চিত নয়—এই অনিশ্চয়তাই ফুটবলকে এত সুন্দর করে তোলে।

আমি বরাবরই লাতিন আমেরিকার ফুটবলের ভক্ত, বিশেষ করে ব্রাজিল। ওদের খেলার মধ্যে একটা আলাদা ছন্দ আছে, একটা শিল্প আছে।

সমুদ্রের ধারে, বালির ওপর খেলে বড় হওয়া এই খেলোয়াড়দের মধ্যে একটা স্বাভাবিক ফ্লেয়ার থাকে। ওরা শুধু খেলে না, ওরা খেলার মধ্যে একটা গল্প তৈরি করে।

এই কারণেই ব্রাজিল আমার এত প্রিয়।

প্রিয় দল যখন হেরে যায় বা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ে, তখন সত্যি বলতে খুব খারাপ লাগে। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিদায়ও ঠিক তেমনই একটা মুহূর্ত ছিল।

সেই কষ্টটা আবার নতুন করে অনুভব করতে চাই না। তাই অনেক সময় নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে রাখি। খেলা কম দেখি, মনটাকে অন্যদিকে রাখার চেষ্টা করি।

এটা হয়তো অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছেই খুব পরিচিত একটা অনুভূতি।

এখন আমি শুধু একজন দর্শক নই, একজন পেশাদারও। আমার কাজের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা আছে। শুটিং সেটে গিয়ে ক্লান্ত মুখে দাঁড়ানো যায় না।

রাত জেগে খেলা দেখলে চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল পড়ে—যা মেকআপ দিয়ে ঢাকতে গেলেও সমস্যা হয়। তাই অনেক সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

তবে সুযোগ পেলেই খেলা দেখি। কারণ এই ভালোবাসাটা ছেড়ে থাকা যায় না।

এবারের বিশ্বকাপে একটা জিনিস খুব ভালো লেগেছে—কম শক্তিশালী দলগুলোর অসাধারণ পারফরম্যান্স। তারা যেভাবে বড় দলগুলোর সঙ্গে লড়াই করছে, সেটা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।

এতে করে খেলার সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। বোঝা যায়, ফুটবলে নাম বা ইতিহাস সবকিছু নয়—পারফরম্যান্সই আসল।

একজন ফুটবলপ্রেমী হিসেবে এটা আমাকে ভীষণ গর্বিত করে।

আমাদের পাড়ার একটা মজার দৃশ্য আছে। সামনে দিকটা পুরো আর্জেন্টিনা সমর্থক, আর পিছনের দিকটা ব্রাজিল। এই দুই দলের মধ্যে রেষারেষি যেন একটা আলাদা উৎসব তৈরি করে।

কোথাও পতাকা, কোথাও জার্সি, কোথাও আবার রাতভর চিৎকার—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম পরিবেশ।

সত্যি বলতে কী, বাঙালির মতো করে বিশ্বকাপ উদযাপন বোধহয় আর কেউ করতে পারে না। এখানে ফুটবল শুধু খেলা না, এটা একটা আবেগ, একটা পরিচয়।

সময় বদলেছে, জীবন বদলেছে, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা বদলায়নি। ছোটবেলার সেই রাত জাগা, দাদুর সঙ্গে খেলা দেখা, বাবার সঙ্গে তর্ক—সবকিছু আজও মনে গেঁথে আছে।

হয়তো এখন আগের মতো সময় পাই না, কিন্তু সুযোগ পেলেই আবার সেই পুরনো অনুভূতিগুলো ফিরে আসে।

ফুটবল আসলে শুধু একটা খেলা নয়। এটা আমাদের জীবনের গল্পের একটা অংশ—যেখানে আছে পরিবার, স্মৃতি, আবেগ আর ভালোবাসা।