বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় আসছে। এই সফরকে ঘিরে দেশের অর্থনৈতিক মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ, সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচি, অর্থনৈতিক সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা সবকিছুই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সফরকালে আইএমএফ প্রতিনিধিদল অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করবে।
এই বৈঠকগুলোর মূল লক্ষ্য হবে বাংলাদেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা। পাশাপাশি সরকারের নতুন সংস্কার পরিকল্পনা, রাজস্ব আহরণে অগ্রগতি, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির কাঠামো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি পূর্ণাঙ্গ ঋণ চুক্তির আলোচনা নয়; বরং ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ভিত্তি তৈরির জন্য একটি মূল্যায়নমূলক সফর।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। পরে এর পরিমাণ বাড়িয়ে প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচটি কিস্তিতে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে।
তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। এর প্রধান কারণ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি।
বিশেষ করে—
রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত হারে না বাড়া
বাজারভিত্তিক বিনিময় হার পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া
ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব
জ্বালানির স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে বিলম্ব
নতুন সরকার মনে করছে, আগের কর্মসূচির সময়কার অর্থনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন তিন বছরের একটি ঋণ কর্মসূচি প্রয়োজন।
আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়ে আসছে। এবারের আলোচনাতেও সংস্কার হবে অন্যতম প্রধান বিষয়।
প্রত্যাশিত সংস্কারের মধ্যে রয়েছে—
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আধুনিকীকরণ
কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি
কর অব্যাহতি কমানো
ভ্যাট ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর
কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি
করের আওতা সম্প্রসারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারে, তাহলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সরকারি বেতন-ভাতা পরিচালনায় ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক সংকট এবং সুশাসনের ঘাটতি নিয়ে আইএমএফ একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এবারের আলোচনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে—
খেলাপি ঋণ কমানোর কার্যকর পরিকল্পনা
দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন
পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন নিশ্চিত করা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি শক্তিশালী করা
মূলধন ঘাটতি পূরণ
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংস্কার
সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংকিং খাত সংস্কারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। আইএমএফ এবার সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে।
এবারের সফরের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হতে পারে নবম জাতীয় পে-স্কেল।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। আর এটি পুরোপুরি কার্যকর হলে প্রতিবছর অতিরিক্ত ব্যয় এক লাখ ৬ হাজার কোটিরও বেশি হতে পারে।
এই বিপুল অর্থের উৎস কী হবে, তা নিয়ে আইএমএফ বিস্তারিত জানতে চাইতে পারে।
বিশেষভাবে যেসব বিষয় আলোচনায় আসতে পারে—
অতিরিক্ত অর্থ কোথা থেকে আসবে
নতুন কর আরোপ করা হবে কি না
সরকারি ঋণ বাড়বে কি না
বাজেট ঘাটতির পরিমাণ কত বাড়তে পারে
মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে রাজস্ব আহরণ জিডিপির তুলনায় তুলনামূলক কম হওয়ায় এত বড় ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, এর বড় একটি কারণ আমদানি কমে যাওয়া।
ভবিষ্যতে শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে আমদানিও বাড়বে। তখন আবার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সে কারণে আইএমএফ এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো দেখতে চায়, যেখানে রিজার্ভ শুধু ঋণের ওপর নির্ভর করবে না; বরং রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হবে।
নতুন আইএমএফ কর্মসূচি অনুমোদিত হলে কিছু অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্ভাব্য পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে—
কর ও ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি
কিছু কর অব্যাহতি বাতিল
জ্বালানি ভর্তুকি আরও কমানো
বাজারভিত্তিক বিনিময় হার পুরোপুরি কার্যকর করা
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার
তবে সরকার জানিয়েছে, এসব পদক্ষেপ ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে একাধিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
উচ্চ বাজেট ঘাটতি
উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের দায় বৃদ্ধি
এলডিসি উত্তরণের পর সহজ শর্তের ঋণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা
বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি
নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজন
এই পরিস্থিতিতে নতুন আইএমএফ কর্মসূচি শুধু বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগই তৈরি করবে না, বরং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের কাছেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতি আস্থার বার্তা দেবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সফরের মূল্যায়ন ইতিবাচক হলে পরবর্তী ধাপে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু হবে। তখন ঋণের পরিমাণ, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের শর্ত চূড়ান্ত হতে পারে।
অন্যদিকে, যদি আইএমএফ মনে করে সংস্কারের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়, তাহলে আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি নতুন ঋণের শর্ত আরও কঠোর হতে পারে।

