খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeআবহাওয়ামাত্র ৪০°C-তেই ইউরোপে মৃত্যুমিছিল! ৫০°C সহ্য করেও ভারত কেন টিকে থাকে?

মাত্র ৪০°C-তেই ইউরোপে মৃত্যুমিছিল! ৫০°C সহ্য করেও ভারত কেন টিকে থাকে?

সাম্প্রতিক ইউরোপীয় তাপপ্রবাহের সময় বহু এলাকায় প্রায় বাতাসই ছিল না। এই স্থির পরিবেশের কারণে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের হতে পারেনি। ফলে অস্বস্তি বেড়েছে এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, পর্তুগালসহ একাধিক দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি হয়েছে, কোথাও আবার অতিরিক্ত গরমের কারণে শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই পরিস্থিতির নানা ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—ভারতে যখন ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও মানুষ কাজকর্ম চালিয়ে যায়, তখন ইউরোপে ৪০ ডিগ্রিতেই এত বিপর্যয় কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু থার্মোমিটারের সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান, নগর পরিকল্পনা, বাড়ির নকশা এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে তাপমাত্রার প্রভাব গভীরভাবে জড়িত। তাই একই তাপমাত্রা দুই অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা একমাত্র সূচক নয় যা মানুষের শরীরে গরমের প্রভাব নির্ধারণ করে। বাতাসের আর্দ্রতা, বাতাসের গতি, সূর্যের তীব্রতা, রাতের তাপমাত্রা এবং পরিবেশের অবস্থা মিলেই গরম কতটা অসহনীয় হবে তা নির্ধারিত হয়।

সাম্প্রতিক ইউরোপীয় তাপপ্রবাহে দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও অনেক বেশি ছিল। ফলে মানুষ পর্যাপ্ত বিশ্রাম বা স্বস্তি পায়নি। দীর্ঘ সময় ধরে শরীর ঠান্ডা হতে না পারায় হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ভারত এবং ইউরোপের ভৌগোলিক অবস্থান এক নয়। ভারত পৃথিবীর নিরক্ষরেখার তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।

অন্যদিকে ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ উত্তর গোলার্ধের উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত। গ্রীষ্মকালে সেখানে দিনের দৈর্ঘ্য অনেক বেশি হয়। সূর্যের আলো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে থাকে। ফলে তাপমাত্রা হয়তো ভারতের তুলনায় কিছুটা কম দেখায়, কিন্তু দীর্ঘ সময়ের তাপ শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।

ভারতের বহু শহরে ধুলাবালি ও বায়ুদূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। এসব সূক্ষ্ম কণা সূর্যের আলো কিছুটা ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে সরাসরি তাপের প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে কম অনুভূত হতে পারে।

অন্যদিকে ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলে আকাশ অনেক পরিষ্কার থাকে। ফলে সূর্যের রশ্মি বাধাহীনভাবে ভূমিতে পৌঁছে যায় এবং পৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। এতে বাইরে অবস্থান করা মানুষের কাছে গরম আরও তীব্র মনে হয়।

মানুষের শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু বাতাসের গতি কমে গেলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না এবং শরীরের স্বাভাবিক শীতল হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।

সাম্প্রতিক ইউরোপীয় তাপপ্রবাহের সময় বহু এলাকায় প্রায় বাতাসই ছিল না। এই স্থির পরিবেশের কারণে শরীরের অতিরিক্ত তাপ বের হতে পারেনি। ফলে অস্বস্তি বেড়েছে এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইউরোপের অধিকাংশ বাড়ি তৈরি হয়েছে দীর্ঘ ও তীব্র শীত মোকাবিলার জন্য। দেয়াল, জানালা এবং ছাদ এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যাতে ঘরের তাপ বাইরে বেরিয়ে না যায়।

কিন্তু গ্রীষ্মে এই একই বৈশিষ্ট্য উল্টো সমস্যার সৃষ্টি করে। বাইরের গরম ঘরে ঢুকে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। ফলে ঘরের ভেতর দ্রুত তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকেও বেশি গরম অনুভূত হয়।

ভারতের তুলনায় ইউরোপে অনেক বাড়িতে বড় বারান্দা, খোলা জানালা কিংবা প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অতীতে তীব্র গরমের প্রয়োজন না থাকায় বহু বাড়িতে ফ্যান বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও ছিল না। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ায় এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ভারতের মানুষ বছরের পর বছর উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে বসবাস করে আসছেন। তাই তাদের শরীর ও দৈনন্দিন জীবন অনেকটাই এই আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। গরমের সময় হালকা পোশাক, পর্যাপ্ত পানি পান, ছায়ায় বিশ্রাম এবং কাজের সময়সূচি পরিবর্তনের মতো অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতীয়রা গরমে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। প্রতি বছর ভারতেও তাপপ্রবাহের কারণে বহু মানুষ অসুস্থ হন এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। তাই শুধু সহ্যক্ষমতার ভিত্তিতে দুই অঞ্চলের তুলনা করা বাস্তবসম্মত নয়।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের সংখ্যা, স্থায়িত্ব এবং তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে। ইউরোপে আগে যে ধরনের চরম গরম খুব কম দেখা যেত, এখন তা প্রায় নিয়মিত ঘটছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক শহর এখনও পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেনি। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, অবকাঠামো এবং জনজীবনের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, ইউরোপের ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রাকে ভারতের ৪৫ বা ৫০ ডিগ্রির সঙ্গে তুলনা করে হাস্যরস করা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই তুলনা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।

কারণ তাপমাত্রা ছাড়াও আর্দ্রতা, বাতাসের গতি, নগর পরিবেশ, ভবনের নকশা, মানুষের অভিযোজন ক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থা—সবকিছু মিলিয়েই গরমের প্রকৃত প্রভাব নির্ধারিত হয়। তাই একই তাপমাত্রা দুই দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন অনুভূতি এবং ভিন্ন মাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইউরোপে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা কেন এত বড় সংকট তৈরি করে, তার উত্তর শুধুমাত্র থার্মোমিটারের সংখ্যায় লুকিয়ে নেই। ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘ দিনের সূর্যালোক, পরিষ্কার আকাশ, কম বাতাস, শীতপ্রধান আবহাওয়ার জন্য তৈরি বাড়িঘর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব ইউরোপের তাপপ্রবাহকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

অন্যদিকে ভারত দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তবুও অতিরিক্ত গরম ভারতের জন্যও সমানভাবে উদ্বেগের বিষয়। তাই ইউরোপ ও ভারতের গরমকে শুধুমাত্র তাপমাত্রার সংখ্যার ভিত্তিতে তুলনা না করে, প্রতিটি অঞ্চলের জলবায়ু ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।