রাজধানী ঢাকায় তীব্র গ্যাস সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। একদিকে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে অটোরিকশা ও প্রাইভেটকার চালকদের। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে অনেক এলাকায় চুলা জ্বলছেই না। ফলে কেউ ইলেকট্রিক চুলা, আবার কেউ বাধ্য হয়ে লাকড়ির চুলায় রান্না করছেন।
শুধু জ্বালানি সংকট নয়, এর প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, আয়-রোজগার এবং পারিবারিক ব্যয়ের ওপরও। বিশেষ করে সিএনজি চালকদের একটি বড় অংশ রাতের পর রাত পাম্পের সামনে কাটিয়েও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে একদিকে যেমন তাদের কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে আয়।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) ভোরে রাজধানীর হাজীপাড়া সিএনজি পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, গ্যাস নিতে অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ সারি। অনেক চালক রাত থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ রাত ৮টায় সিরিয়াল দিয়েও ভোরে গ্যাস পেয়েছেন। আবার ভোররাতে এসে লাইনে দাঁড়ানো অনেক গাড়িচালককেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
পাম্পটির দুই পাশে তৈরি হয়েছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি। এক পাশের লাইন বিটিভি পেরিয়ে রামপুরা ব্রিজের দিকে চলে গেছে। অন্য পাশের সারি বিস্তৃত হয়েছে মালিবাগ মোড় পেরিয়ে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের কাছাকাছি পর্যন্ত।
প্রাইভেটকার চালক সোহেল রানা বলেন, জীবনে গ্যাসের জন্য এত বড় সিরিয়াল দেখেননি। ভোর ৪টার দিকে পাম্পে এসে তিনি দেখেন, গাড়ির সারি অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে। কোন লাইনে দাঁড়ালে দ্রুত গ্যাস পাওয়া যাবে, সেটিও বুঝতে পারছিলেন না।
আরেক চালক সুমন জানান, ভোর ৪টার দিকে এসে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও গ্যাস পাননি। আরও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে বলে ধারণা করছেন তিনি। এত দীর্ঘ অপেক্ষার পরও হয়তো ২০০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও তার সন্দেহ রয়েছে।
গ্যাসের সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সিএনজি অটোরিকশাচালকরা। কারণ গাড়িতে অল্প পরিমাণ গ্যাস নিয়ে কয়েকটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার তাদের পাম্পে ফিরতে হচ্ছে। এরপর নতুন করে সিরিয়ালে দাঁড়াতে হচ্ছে।
প্রায় ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর গ্যাস পাওয়া রিপন মিয়া জানান, তিনি মাত্র ১৭৯ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। এত অল্প গ্যাস দিয়ে কতক্ষণ গাড়ি চালানো সম্ভব, সেই প্রশ্নই এখন তার সামনে।
চালক রহিম শিকদার জানান, রাত ১২টার পর সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর মাত্র ৮০ টাকার গ্যাস পেয়েছেন। আরও কিছু গ্যাস পাওয়ার আশায় আবার লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।
পাম্পের বিক্রয়কর্মী ইউসুফের ভাষ্য, গ্যাসের চাপ খুব কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন যে সকালেও পাম্পের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
হাজীপাড়ার পাশাপাশি রাজধানীর মেরুল বাড্ডা, তেজগাঁও, মহাখালী, উত্তরা, মিরপুর, গাবতলী ও কমলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। অনেক পাম্পে রাত ১০টার পর থেকেই গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করেও চালকদের কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ গ্যাস মিলছে না।
পাম্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দিনের বেলায় অনেক সময় গ্যাস থাকে না। থাকলেও চাপ এত কম থাকে যে স্বাভাবিকভাবে বিক্রি করা যায় না। ফলে দিনের একটা বড় সময় পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
চালকদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। আগে একটি সিএনজি অটোরিকশায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকার গ্যাস নেওয়া যেত। চাপ ভালো থাকলে কখনো ৫০০ টাকার গ্যাসও নেওয়া সম্ভব হতো। ফলে সারাদিন গাড়ি চালিয়ে রাতে গ্যাস নিয়ে পরদিন আবার কাজে বের হওয়া যেত।
এখন সেই নিয়ম পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। অল্প গ্যাসে দুই-তিনটি ট্রিপ দেওয়ার পরই গাড়ির গ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপর আবার পাম্পের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।
চালক আবু বকর বলেন, রাত ১০টার দিকে লাইনে দাঁড়ালে কখনো রাত দেড়টা বা দুইটার দিকে গ্যাস পাওয়া যায়। কিন্তু তখনও গাড়িতে ৭০, ৮০ বা সর্বোচ্চ ১০০ টাকার মতো গ্যাস ঢোকে। কয়েকটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার পাম্পে ফিরতে হয়। দ্বিতীয় দফায় আরও কম গ্যাস পাওয়া যায়।
তার মতে, ভোর পর্যন্ত গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে দিনের বড় একটি অংশ চলে যায়। এরপর সকাল থেকে কয়েকটি ট্রিপ দেওয়ার পর আবার গ্যাসের সংকটে পড়তে হয়। এতে আয়-ব্যয়ের হিসাব কোনোভাবেই মিলছে না।
চালকদের ভাষ্য, একটি দিনে দুই হাজার টাকা ভাড়া তুললেও গাড়ির জমা, গ্যাস, খাবার ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার পর হাতে খুব সামান্য টাকা থাকে। অথচ সংসারের খরচ চালাতে তাদের প্রতিদিনই কাজ করতে হচ্ছে।
চালক আব্দুল্লাহ বলেন, এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্যাসের সংকট চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। এখন গ্যাস নিতে অনেক চালককে রাস্তায় রাত কাটাতে হচ্ছে।
সড়কের দুর্ভোগের পাশাপাশি রাজধানীর বাসাবাড়িতেও গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় দিনের পর দিন চুলায় গ্যাসের দেখা মিলছে না। আগে কখনো কখনো রাতে সামান্য গ্যাস পাওয়া গেলেও এখন অনেক জায়গায় দিন-রাত কোনো সময়েই পর্যাপ্ত গ্যাস মিলছে না।
বনশ্রীর গৃহবধূ আসমা খানম জানান, বারবার চুলা জ্বালানোর চেষ্টা করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এক মাসের বেশি সময় ধরে সমস্যাটি চললেও সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
গ্যাসের বিকল্প হিসেবে তিনি ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন। কিন্তু সেখানেও রয়েছে আরেক সমস্যা। রান্নার সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে রান্না বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় রান্না করা খাবারও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
রামপুরার গৃহবধূ সেলিনা আকতার বলেন, আগে রাতে কিছু সময় গ্যাস পাওয়া যেত। এখন সেটিও নেই। ফলে ইলেকট্রিক চুলার ওপর নির্ভর করেই রান্না করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে বাড্ডার নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো আরও বড় সংকটে পড়েছে। গৃহবধূ আরিফা আক্তার জানান, ইলেকট্রিক চুলা কেনার সামর্থ্য অনেক পরিবারের নেই। তাই গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে লাকড়ির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান গ্যাস সংকটের অন্যতম কারণ মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে কারিগরি সমস্যা। দেশের এলএনজি সরবরাহের বড় একটি অংশ দুটি ভাসমান টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর মধ্যে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্য টার্মিনাল থেকেও স্বাভাবিকভাবে এলএনজি সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের ঘাটতি আরও বেড়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশন এবং বাসাবাড়িতে। বিশেষ করে সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকরা সংকটের তীব্রতা বেশি অনুভব করছেন।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার সাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বানের পাশাপাশি নতুন করে বিপুলসংখ্যক কূপ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে।
গ্যাসের চাহিদা পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে চাইলেই রাতারাতি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়।
দেশে বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। গ্যাস আমদানি বাড়াতে তৃতীয় একটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি বাতিল হয়েছে। নতুন করে আরেকটি এফএসআরইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
এ ছাড়া মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ল্যান্ডবেইজ এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন।

