বর্ষার শেষ পর্বে ফের দুর্যোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণাবর্ত ক্রমেই শক্তি বাড়াচ্ছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই ঘূর্ণাবর্ত আগামী কয়েক ঘণ্টায় আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কলকাতা-সহ সংলগ্ন এলাকাতেও বৃষ্টির দাপট বাড়তে পারে।
বুধবার সকাল থেকেই কলকাতা এবং আশপাশের জেলাগুলির আকাশ ছিল মেঘে ঢাকা। কোথাও কোথাও সকাল থেকেই শুরু হয়েছে বৃষ্টি। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের কারণে শহর ও শহরতলিতে ফের জল জমার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ এর আগে অল্প সময়ের প্রবল বৃষ্টিতেই কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায় জলমগ্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এবার বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণাবর্ত আরও শক্তিশালী হলে পরিস্থিতি কতটা কঠিন হতে পারে, সেদিকেই নজর সাধারণ মানুষের।
আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলের কাছাকাছি একটি ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়েছে। সেটি বর্তমানে ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় এই ঘূর্ণাবর্ত আরও ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ঘূর্ণাবর্ত শক্তিশালী হলে তার প্রভাবে বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন স্থলভাগে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে। বিশেষ করে উপকূলবর্তী জেলা এবং দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিতে শুধু বৃষ্টিই নয়, দমকা হাওয়াও তৈরি হতে পারে। উপকূলবর্তী এলাকায় তাই বাড়তি সতর্কতা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এই ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গে একদিন বা দুদিন নয়, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টির পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে।
বিশেষ করে উপকূলের জেলাগুলিতে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলাতেও ভারী বৃষ্টি হতে পারে।
বৃষ্টির সঙ্গে কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ এবং দমকা হাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষকে আবহাওয়ার আপডেট দেখে বাইরে বের হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি নজর কলকাতার দিকে। কারণ মহানগরে সামান্য সময়ের প্রবল বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় জল জমে যায়। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির অভিজ্ঞতার পর নতুন করে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বুধবার কলকাতাতেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আকাশ সকাল থেকেই মেঘাচ্ছন্ন। ফলে দিনের বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টির দাপট বাড়তে পারে।
কলকাতার পাশাপাশি হাওড়া এবং হুগলি জেলাতেও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সতর্কতা রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।
তবে কলকাতা ফের পুরোপুরি জলের তলায় চলে যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। বৃষ্টির তীব্রতা, একটানা বৃষ্টির সময় এবং স্থানীয় নিকাশি ব্যবস্থার পরিস্থিতির উপর জল জমার মাত্রা অনেকটাই নির্ভর করবে।
ঘূর্ণাবর্তের প্রভাবে উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি প্রতিকূল হতে পারে। সমুদ্র উত্তাল হওয়ার পাশাপাশি দমকা হাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই কারণেই মৎস্যজীবীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ১১ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে।
সমুদ্রে থাকা মৎস্যজীবীদেরও দ্রুত নিরাপদ স্থানে ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঘূর্ণাবর্তের শক্তি বাড়লে সমুদ্রের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
এবারের আবহাওয়ার পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এর প্রভাব খুব দ্রুত শেষ নাও হতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পর্যন্ত দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় অস্থিরতা বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর অর্থ এই নয় যে প্রতিদিন সব জায়গায় অতি ভারী বৃষ্টি হবে। বরং বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির তীব্রতা বাড়তে বা কমতে পারে। কোথাও কয়েক পশলা হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে, আবার কোথাও স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিও নামতে পারে।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে শহরাঞ্চলে জল জমা, যানজট এবং স্বাভাবিক জনজীবনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা থাকে।
বুধবার দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কলকাতা ছাড়াও হাওড়া, হুগলি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা নজরে রয়েছে।
উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ার প্রভাবও থাকতে পারে। পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকাতেও বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।
তাই নিচু এলাকা, নদী বা খালের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। কৃষিকাজের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাব পড়তে পারে।
দক্ষিণবঙ্গের তুলনায় উত্তরবঙ্গে আপাতত পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, উত্তরবঙ্গে এই মুহূর্তে অতি ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা নেই।
তবে তার অর্থ উত্তরবঙ্গে একেবারেই বৃষ্টি হবে না, এমন নয়। বিভিন্ন এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের তুলনায় ঘূর্ণাবর্তের সরাসরি প্রভাব উত্তরবঙ্গে তুলনামূলক কম থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও কলকাতায় ভ্যাপসা গরম পুরোপুরি কাটেনি। বুধবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে থাকতে পারে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকতে পারে ২৭.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি।
বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণও যথেষ্ট বেশি। সর্বোচ্চ আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। ফলে বৃষ্টির মধ্যেও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
আর্দ্রতা বেশি থাকলে বৃষ্টি থামার পরেও গরম ও ভ্যাপসা অনুভূতি বজায় থাকে। শহরের সাধারণ মানুষের কাছে বর্ষাকালে এই ধরনের আবহাওয়া নতুন নয়।
বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সমুদ্রের উপর নির্দিষ্ট ধরনের বায়ুচাপের পরিবর্তন এবং মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তার কারণে এ ধরনের আবহাওয়া ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।
কোনও ঘূর্ণাবর্ত শক্তিশালী হলে তা নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। আবার সব ঘূর্ণাবর্ত যে নিম্নচাপে পরিণত হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতেও তাই আবহাওয়া দপ্তর নিয়মিত নজর রাখছে। ঘূর্ণাবর্তের গতিপথ, শক্তি এবং স্থলভাগের দিকে অগ্রসর হওয়ার মাত্রার উপর পরবর্তী সতর্কতা নির্ভর করবে।
কলকাতার জলমগ্নতার সমস্যা নতুন নয়। মহানগরের বহু এলাকায় নিচু রাস্তা, ঘনবসতি এবং বিপুল জনসংখ্যার কারণে অতিবৃষ্টির সময় দ্রুত জল নামানো কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে স্বল্প সময়ে খুব বেশি বৃষ্টি হলে নিকাশি নালা ও পাম্পিং ব্যবস্থার উপর চাপ বেড়ে যায়। একই সময়ে যদি জোয়ার থাকে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে জল নামার গতি আরও কমতে পারে।
তাই ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস এলেই কলকাতার ক্ষেত্রে শুধু বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বৃষ্টি কতক্ষণ ধরে হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দক্ষিণবঙ্গে ভারী বৃষ্টি হলে সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়ে যান চলাচলে। কলকাতা ও আশপাশের শহরাঞ্চলে রাস্তায় জল জমলে যানবাহনের গতি কমে যায়। অফিসযাত্রী, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং ব্যবসায়ীদের সমস্যায় পড়তে হয়।
ট্রেন পরিষেবা, বিমান পরিষেবা বা সড়ক যোগাযোগেও কোথাও কোথাও সাময়িক সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে কোনও পরিষেবা বন্ধ হবে কি না, তা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে।
উপকূলবর্তী এলাকায় আবার সমস্যা আলাদা। সেখানে সমুদ্র উত্তাল হওয়া, ঝোড়ো হাওয়া এবং ভারী বৃষ্টির কারণে মাছ ধরা ও নৌযান চলাচলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।
দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষিকাজ বর্ষার বৃষ্টির উপর নির্ভরশীল। স্বাভাবিক বৃষ্টি কৃষির জন্য উপকারী হলেও অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
জমিতে দীর্ঘ সময় জল জমে থাকলে বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নদী, খাল ও নিচু জমির আশপাশে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
তাই কৃষকদেরও স্থানীয় প্রশাসন এবং আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কতা মেনে চলার প্রয়োজন রয়েছে।
সব মিলিয়ে দক্ষিণবঙ্গের জন্য আগামী কয়েক দিন গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণাবর্ত শক্তি বাড়াচ্ছে এবং তার প্রভাবে রাজ্যের দক্ষিণ অংশে বৃষ্টির সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে।
কলকাতাতেও ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। তবে মহানগর নিশ্চিতভাবে প্লাবিত হবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। বৃষ্টির তীব্রতা ও স্থায়িত্বের পাশাপাশি স্থানীয় নিকাশি ব্যবস্থার কার্যকারিতার উপর পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
উপকূলবর্তী এলাকায় ইতিমধ্যেই সতর্কতা জারি হয়েছে। মৎস্যজীবীদের সমুদ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের মানুষকেও আগামী কয়েক দিন আবহাওয়ার পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে।
বর্ষার শেষ পর্বে বঙ্গোপসাগরের এই ঘূর্ণাবর্ত কতটা শক্তিশালী হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার গতিপথ কোন দিকে যায়, এখন সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপাতত আবহাওয়া দপ্তরের নজর ঘূর্ণাবর্তের গতিবিধির দিকে। আর কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের মানুষের নজর আগামী কয়েক দিনের আকাশের দিকে।

