বিশ্বের এক প্রান্তে সুঠাম শরীর, সিক্স প্যাক বা মেদহীন গঠনই পুরুষের সৌন্দর্যের মাপকাঠি। কিন্তু পৃথিবীর আরেক কোণে ঠিক উল্টো ছবিই দেখা যায়। সেখানে যার শরীর সবচেয়ে স্থূল, যার ভুঁড়ি সবচেয়ে বড়, তাকেই ধরা হয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সম্মানিত পুরুষ হিসেবে। শুধু তাই নয়, সেই ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আবহ, আর সমাজের সর্বোচ্চ সম্মানও জোটে তাঁর কপালে।
এই ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যের দেখা মেলে আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার ওমো উপত্যকায়, যেখানে বসবাসকারী বোদি (Bodi) সম্প্রদায়ের কাছে স্থূল শরীরই সৌন্দর্য, শক্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
আধুনিক সমাজে ফিটনেস, জিম আর স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বোদি সংস্কৃতিতে সৌন্দর্যের ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তাদের বিশ্বাস, একজন পুরুষ যত বেশি স্থূল হবেন, তিনি তত বেশি সম্মান, সমৃদ্ধি এবং আকর্ষণের প্রতীক। তাই প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হওয়া কা’এল (Ka’el) উৎসবে সবচেয়ে স্থূল পুরুষকে বেছে নেওয়া হয় বছরের সেরা পুরুষ হিসেবে।
এই প্রতিযোগিতা শুধু বিনোদনের জন্য নয়; এটি বোদি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সামাজিক মর্যাদার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া মোটেও সহজ নয়।
উৎসবের প্রায় ছয় মাস আগে বোদি সম্প্রদায়ের ১৪টি গোত্র থেকে একজন করে অবিবাহিত যুবককে নির্বাচন করা হয়।
এরপর শুরু হয় ওজন বাড়ানোর বিশেষ প্রস্তুতি। প্রতিযোগীরা প্রায় সব ধরনের শারীরিক পরিশ্রম বন্ধ করে দেন এবং অধিকাংশ সময় কুঁড়েঘরে বিশ্রাম নেন।
তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে যতটা সম্ভব দ্রুত শরীরের ওজন বৃদ্ধি করা।
ওজন বৃদ্ধির জন্য বোদি সম্প্রদায়ের প্রতিযোগীদের বিশেষ খাদ্য দেওয়া হয়।
খাদ্যতালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান হলো—
- গরুর তাজা দুধ
- গরুর রক্ত
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। বোদি সংস্কৃতিতে গরুকে অত্যন্ত পবিত্র প্রাণী হিসেবে দেখা হয়। তাই রক্ত সংগ্রহের জন্য গরুকে হত্যা করা হয় না।
বরং একটি ছোট ছিদ্র করে অল্প পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ করা হয় এবং পরে ক্ষতস্থান কাদা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে প্রাণীটির কোনও বড় ক্ষতি না হয়।
এই রক্ত ও দুধের মিশ্রণই প্রতিযোগীদের দ্রুত ওজন বাড়াতে সাহায্য করে বলে বিশ্বাস করা হয়।
ছয় মাসের প্রস্তুতির পর কা’এল উৎসবের দিন প্রতিযোগীদের চেহারায় নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যায়।
তারা শরীরে মাটি ও ছাই মেখে, ঐতিহ্যবাহী অলংকারে নিজেকে সাজিয়ে উৎসবস্থলে হাজির হন।
এরপর প্রতিযোগীরা একটি পবিত্র গাছকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে প্রদক্ষিণ করেন। সেই সময় গোটা সম্প্রদায় সেখানে উপস্থিত থাকে।
এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
নারীরা শুধু দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকেন না, বরং সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী নির্বাচনেও তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।
বোদি সমাজে স্থূল শরীরকে পুরুষের সৌন্দর্য, স্বাস্থ্য এবং সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই প্রতিযোগিতার ফলাফল অনেক সময় সামাজিক মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার ওপরও প্রভাব ফেলে।
প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ব্যক্তি কোনও অর্থ, জমি বা দামী উপহার পান না।
তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সম্পূর্ণ বোদি সমাজের আজীবন সম্মান, মর্যাদা এবং স্বীকৃতি।
‘বছরের সবচেয়ে স্থূল পুরুষ’ হিসেবে নির্বাচিত হওয়া তাঁদের কাছে এমন এক গৌরব, যা কোনও বস্তুগত পুরস্কারের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান।
নৃতত্ত্ববিদদের মতে, বোদি সম্প্রদায়ের এই ঐতিহ্যের পেছনে রয়েছে তাদের জীবনযাপন ও পরিবেশগত বাস্তবতা।
যেখানে খাদ্যের প্রাপ্যতা সবসময় নিশ্চিত নয়, সেখানে স্বাস্থ্যবান ও স্থূল দেহকে সমৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবারের সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
তাই তাদের সমাজে যে বৈশিষ্ট্য অন্য অনেক দেশে অস্বাস্থ্যকর বলে বিবেচিত হতে পারে, সেটিই সাংস্কৃতিকভাবে সৌন্দর্য ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে সৌন্দর্যের ধারণা এক নয়। কোথাও রোগা শরীর আদর্শ, কোথাও সুঠাম পেশিবহুল গঠন জনপ্রিয়, আবার কোথাও ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির কারণে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ড গড়ে উঠেছে।
বোদি সম্প্রদায়ের কা’এল উৎসব সেই বৈচিত্র্যেরই একটি অনন্য উদাহরণ। এটি মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্যের ধারণা কেবল শারীরিক গঠন দিয়ে নয়, বরং সমাজ, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের আলোকে তৈরি হয়।

