খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বিশ্বস্ত বন্ধুই মানসিক সুস্থতা ও সংকট মোকাবিলায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ

ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে পাঁচ হাজার বন্ধু। মোবাইল ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে শত শত নাম। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে লাইক, কমেন্ট, ইনবক্স কিংবা বিভিন্ন গ্রুপে যোগাযোগ হচ্ছে।...
Homeলাইফস্টাইলবিশ্বস্ত বন্ধুই মানসিক সুস্থতা ও সংকট মোকাবিলায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বস্ত বন্ধুই মানসিক সুস্থতা ও সংকট মোকাবিলায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ

প্রকৃত অর্থে নির্ভর করার মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাধারণত খুব বেশি হন না। বরং মানুষের সুখ, মানসিক সুস্থতা ও সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে বন্ধুর সংখ্যার চেয়ে সম্পর্কের গভীরতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে পাঁচ হাজার বন্ধু। মোবাইল ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে শত শত নাম। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে লাইক, কমেন্ট, ইনবক্স কিংবা বিভিন্ন গ্রুপে যোগাযোগ হচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, চারপাশে মানুষের কোনো অভাব নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো হঠাৎ গভীর রাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে কিংবা জরুরি প্রয়োজনে সাহায্যের দরকার হলে এই দীর্ঘ তালিকা থেকে কজনকে নির্দ্বিধায় ফোন করা যাবে?

আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবসকে ঘিরে এমন প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদদের বিভিন্ন গবেষণা বলছে, একজন মানুষের জীবনে পরিচিত মানুষের সংখ্যা যতই বেশি হোক না কেন, প্রকৃত অর্থে নির্ভর করার মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাধারণত খুব বেশি হন না। বরং মানুষের সুখ, মানসিক সুস্থতা ও সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে বন্ধুর সংখ্যার চেয়ে সম্পর্কের গভীরতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। একসময় বন্ধুত্ব গড়ে উঠত একসঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা, খেলাধুলা বা একই প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার মাধ্যমে। এখন একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট গ্রহণ করলেই কেউ ‘বন্ধু’ হয়ে যান। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজার হাজার বন্ধুর তালিকা তৈরি হলেও বাস্তব জীবনের সম্পর্ক সেই অনুপাতে গভীর হয়নি।

অনেকেই প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানান, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন কিংবা ব্যক্তিগত বার্তায় কথা বলেন। কিন্তু বাস্তব জীবনের কঠিন মুহূর্তে দেখা যায়, সেই বিশাল তালিকার খুব অল্প কয়েকজনই পাশে এসে দাঁড়ান। ফলে অনলাইন জনপ্রিয়তা ও বাস্তব বন্ধুত্ব যে এক নয়, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ অধ্যাপক রবিন ডানবার দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, একজন মানুষ গড়ে প্রায় ১৫০টি অর্থবহ সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম। এটি ‘ডানবার নাম্বার’ নামেও পরিচিত।

তবে এই ১৫০ জনের সবাই সমান গুরুত্বপূর্ণ নন। গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পর্কগুলো কয়েকটি স্তরে বিভক্ত থাকে। সবচেয়ে ভেতরের স্তরে থাকেন মাত্র তিন থেকে পাঁচজন মানুষ, যাদের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আবেগগত সংযোগ থাকে। এরপর থাকে প্রায় ১৫ জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা আত্মীয়, তারপর ৫০ জন ভালো পরিচিত এবং ধীরে ধীরে সংখ্যাটি বাড়তে থাকে। কিন্তু সম্পর্ক যত বিস্তৃত হয়, আবেগগত ঘনিষ্ঠতা তত কমে যায়।

ডানবারের সাম্প্রতিক পর্যালোচনামূলক গবেষণাও একই বিষয়কে সমর্থন করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, একজন মানুষের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য হাতে গোনা কয়েকজন বিশ্বস্ত মানুষই সবচেয়ে কার্যকর সামাজিক সহায়তা দিতে পারেন। অর্থাৎ বন্ধুর সংখ্যা নয়, সম্পর্কের গুণগত মানই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বন্ধুত্ব কেবল আনন্দ ভাগাভাগির বিষয় নয়। একজন সত্যিকারের বন্ধু মানুষের মানসিক চাপ কমাতে, আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এবং কঠিন সময়ে আবেগগত সমর্থন দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

ধরা যাক, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল করতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর শত শত বন্ধু থাকলেও হয়তো মাত্র দুই বা তিনজন তাঁর পাশে বসে কথা বলবেন, সাহস দেবেন কিংবা নতুনভাবে শুরু করার অনুপ্রেরণা দেবেন। আবার চাকরি হারানো, পারিবারিক সংকট বা অসুস্থতার সময়ও একই চিত্র দেখা যায়। তখন পরিচিত মানুষের চেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু অনেক বেশি মূল্যবান হয়ে ওঠেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন সম্পর্ক মানুষকে নিরাপত্তাবোধ দেয়। নিজের দুর্বলতা, ভয় বা ব্যর্থতার কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারার মতো মানুষ থাকলে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়।

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) অভিধান অনুযায়ী, বন্ধুত্ব হলো এমন একটি স্বেচ্ছায় গড়ে ওঠা এবং দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক, যেখানে উভয় পক্ষই একে অপরের কল্যাণ, প্রয়োজন ও অনুভূতির প্রতি আন্তরিক থাকেন।

এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং মানসিক সংযোগ। অর্থাৎ শুধুমাত্র নিয়মিত যোগাযোগ করলেই বন্ধুত্ব গভীর হয় না; প্রয়োজন হয় আন্তরিকতা ও আস্থার।

ধরা যাক, রাহাত নামে একজন তরুণের ফেসবুকে প্রায় পাঁচ হাজার বন্ধু রয়েছে। জন্মদিনে শত শত শুভেচ্ছাবার্তা পান তিনি। কিন্তু একদিন রাতে তাঁর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নিতে হয়। তখন তিনি ফোন করেন মাত্র তিনজনকে। সেই তিনজনই দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে প্রয়োজনীয় সহায়তা করেন।

অন্যদিকে শুভ নামে আরেকজনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধু খুব বেশি নেই। কিন্তু তাঁর দুই-তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পাশে থাকেন। বিপদে রক্ত দিতে, হাসপাতালে ছুটে যেতে কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাশে বসে থাকতে তারা কখনো দ্বিধা করেন না।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, প্রকৃত বন্ধুত্ব সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সম্পর্কের গভীরতা, বিশ্বাস এবং দায়িত্ববোধের ওপর।

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন একাকিত্বে ভোগা মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, অনিদ্রা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন মানুষদের মানসিক চাপও তুলনামূলক বেশি থাকে।

অন্যদিকে যাদের জীবনে কয়েকজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু রয়েছেন, তারা সাধারণত কঠিন পরিস্থিতি সহজে মোকাবিলা করতে পারেন। কারণ সংকটের সময় কাউকে পাশে পাওয়া মানসিক শক্তি বাড়িয়ে দেয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একাকিত্ব দূর করার জন্য শুধু নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যথেষ্ট নয়। বরং কয়েকটি সম্পর্ককে সময় দেওয়া, নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরি করাই বেশি কার্যকর।

বন্ধুত্ব সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে এবং যত্নের অভাবে দুর্বলও হয়ে যেতে পারে। তাই নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং একে অপরের প্রতি সম্মান বজায় রাখা জরুরি।

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেকেই মনে করেন, একটি ছোট ফোনকল, একটি বার্তা কিংবা কয়েক মিনিট সময় দেওয়ার মূল্য খুব বেশি নয়। অথচ এমন ছোট ছোট উদ্যোগই একটি সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারে।

বন্ধু দিবস মানেই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করা বা শুভেচ্ছা বিনিময় নয়। এই দিনটি নিজের সম্পর্কগুলোকেও নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ দেয়।

আমাদের ফ্রেন্ডলিস্টে কতজন আছেন, সেটি হয়তো পরিসংখ্যানের বিষয়। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে কজন মানুষ নির্দ্বিধায় পাশে দাঁড়াবেন, সেটিই প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয়।

প্রযুক্তির এই যুগে পরিচিত মানুষের সংখ্যা বাড়ানো সহজ। কিন্তু বিশ্বাস, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে একটি সত্যিকারের বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে প্রয়োজন সময়, মনোযোগ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। তাই বন্ধু দিবসের সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে হাজার পরিচিত মানুষের চেয়ে কয়েকজন বিশ্বস্ত বন্ধু অনেক বেশি মূল্যবান। কারণ জীবনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে সংখ্যাই নয়, মানুষের আন্তরিক উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।