খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আবেদন পর্যালোচনায় ভারত

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ বর্তমানে ভারতের সরকার পর্যালোচনা করছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রচলিত...
Homeবিশ্ব সংবাদইন্ডিয়া নিউজশেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আবেদন পর্যালোচনায় ভারত

শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আবেদন পর্যালোচনায় ভারত

ভারতীয় সরকারের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দিল্লি এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে না। বরং আইনগত ও কূটনৈতিক সব দিক বিবেচনা করেই তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে চায়।

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের অনুরোধ বর্তমানে ভারতের সরকার পর্যালোচনা করছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রচলিত আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ভারতের সংসদীয় একটি স্থায়ী কমিটির প্রশ্নের জবাবে সরকার এ তথ্য জানিয়েছে, যা সম্প্রতি দেশটির সংসদের উভয় কক্ষে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ভারতের সংসদীয় নথিতে উঠে আসা এই বক্তব্য নতুন করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ অবস্থান এবং সম্ভাব্য প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। একই সময়ে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ইচ্ছা প্রকাশও বিষয়টিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

ভারতের সংসদ সদস্য ও কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরি করে। সেই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রসঙ্গও স্থান পায়।

কমিটির প্রশ্নের উত্তরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রত্যর্পণের অনুরোধ যথাযথ কর্তৃপক্ষ আইনগত কাঠামো অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। বিষয়টি এখনও পর্যালোচনাধীন রয়েছে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসারেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ভারতীয় সরকারের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দিল্লি এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে না। বরং আইনগত ও কূটনৈতিক সব দিক বিবেচনা করেই তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে চায়।

প্রতিবেদনে সংসদীয় কমিটি উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়া হয়েছে মূলত দেশটির দীর্ঘদিনের মানবিক ও সভ্যতাগত মূল্যবোধের আলোকে।

কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত ঐতিহাসিকভাবে এমন ব্যক্তিদের আশ্রয় দিয়ে এসেছে, যারা নিজ দেশে চরম সংকট বা নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছেন। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন :  মিশরকে হারিয়েও কেন কেঁদেছিলেন মেসি? পেনাল্টি মিসের পর বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি!

তবে কমিটি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছে, মানবিক সহায়তা দেওয়ার অর্থ রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া নয়।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

সরকারের দাবি অনুযায়ী, তিনি ভারতের ভূখণ্ড থেকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করেননি কিংবা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগও পাননি।

এই ব্যাখ্যায় সংসদীয় কমিটি সন্তোষ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতেও ভারত যেন একই নীতি অনুসরণ করে, সেই সুপারিশও করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে একটি নীতি অনুসরণ করে আসছে দেশটির ভূখণ্ড কোনোভাবেই অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

সংসদীয় কমিটি মনে করে, ভবিষ্যতেও এই নীতি বজায় রাখা উচিত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রেখে সংবেদনশীল পরিস্থিতি মোকাবিলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে ফিরে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান এবং আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নিজের অবস্থান তুলে ধরতে চান।

তিনি আরও বলেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে কিংবা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে—এসব বিষয় সম্পর্কে তিনি অবগত। তবুও তিনি দেশে ফিরতে আগ্রহী, কারণ তার মতে, শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের দেশেই ফিরতে হবে।

এই বক্তব্য প্রকাশের পর বাংলাদেশ ও ভারতে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, শেখ হাসিনার এই মন্তব্যকে এখনই দেশে ফেরার চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন :  ভাইরাল বেবি ছবি থেকে বিশ্বকাপ ফাইনাল! মেসি-ইয়ামালের সিনেমাকেও হার মানানো গল্প

তাদের মতে, এটি অনেকটা বর্তমান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের একটি কৌশলগত বার্তা হতে পারে। অর্থাৎ বাস্তব পরিস্থিতি অনুকূল হলে তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

দিল্লির নীতিনির্ধারণী মহলেও এখন পর্যন্ত শেখ হাসিনার অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়নি।

ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভারত শেখ হাসিনাকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে আশ্রয় দেয়নি। আবার তাকে জোরপূর্বক দেশ ছাড়তেও বলা হচ্ছে না।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা যদি বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশে ফিরতে চান, তাহলে সেটি তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত হবে। অন্যদিকে তিনি যদি আপাতত ভারতে অবস্থান অব্যাহত রাখতে চান, সে বিষয়েও ভারতের অবস্থানে আপাতত কোনো পরিবর্তন নেই।

দিল্লির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মন্তব্য করেছেন, এই মুহূর্তে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি যেমন এগোবে, সেভাবেই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক মামলা দায়ের হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে মোট ৬৬৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৪৫৩টি। একটি মামলায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এসব মামলার কারণে তিনি দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা বর্তমানে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে বিবেচিত।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, আদালতের রায় কার্যকর রয়েছে এবং আইনগতভাবে বিষয়টি সেই অবস্থাতেই আছে।

তবে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের পর আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি কী ধরনের সুযোগ পাবেন, সেটি আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

আরও পড়ুন :  ফিফার সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ! কেন ক্ষুব্ধ স্কালোনি ও বিয়েলসা?

আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, অনুপস্থিত অবস্থায় রায় ঘোষণার পর নির্ধারিত সময় অতিক্রম করলেও শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করলে আপিল করার সুযোগ পেতে পারেন।

তাদের মতে, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় আত্মসমর্পণের পর আপিল গ্রহণের বিষয়ে আদালতের বিবেচনাধিকার রয়েছে। ফলে দেশে ফিরলে তার আইনগত লড়াইয়ের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। অবশ্য এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতই নেবে।

সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু মনে করেন, শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে দ্রুত বিচার এবং দণ্ডাদেশের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তার মতে, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের বিচার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এছাড়া আদালত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না—সে প্রশ্নও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হয়েছে।

তিনি মনে করেন, এসব বিষয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায়ও কোনো না কোনোভাবে বিবেচনায় আসতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বীর আহমেদের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে প্রথমেই তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বক্তব্য বা সমর্থনের প্রশ্নের আগে আদালতের কার্যক্রমই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদালতের সিদ্ধান্ত এবং আইনগত লড়াইয়ের ওপরই পরবর্তী পরিস্থিতির অনেকাংশ নির্ভর করবে।

আন্তর্জাতিক আইনে কোনো ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করা সাধারণত দীর্ঘ ও জটিল একটি প্রক্রিয়া। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি, সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ আইন, মানবাধিকার সংক্রান্ত বিবেচনা এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ সবকিছুই এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভারত সরকারও জানিয়েছে, তারা এই বিষয়টি আইনি কাঠামোর মধ্যেই পরীক্ষা করছে। ফলে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা