বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণাকে ঘিরে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহল এবং ছাত্রদলের দায়িত্বশীল নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা আসছেন, তা নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, এক ডজনেরও বেশি নেতার নাম এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটে দায়িত্ব পালনকারী নেতাদের নামও আলোচনায় রয়েছে।
বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু সাংগঠনিক পদে থাকা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভূমিকা, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ, নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা, সংগঠন পরিচালনার দক্ষতা এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাথে সাথে নেতার বিরুদ্ধে কোন সাংগঠনিক অভিযোগ বা বিতর্ক আছে কি না, সেটাও মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। দলের সর্বচ্চ হাইকমান্ড এধরনের নেতৃত্ব দিতে চায়, আর যারা আগামী দিনে ছাত্রদলকে আরও সংগঠিত করতে পারবে এবং জাতীয় রাজনীতিতে জাতিয়তাবাদি বিএনপির কর্মসূচি বাস্তবায়নে কার্যকর অগ্রনী ভূমিকা রাখবে।
এদিকে সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীরা নিজ নিজ অবস্থান শক্তিশালী করতে বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগও অব্যাহত রেখেছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ মার্চ। ওই দিন মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি এবং নাছির উদ্দীন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে সাত সদস্যের একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে একই বছরের ১৫ জুন কমিটিকে আরও সম্প্রসারণ করা হয়। তখন ৩৯ জন সহ-সভাপতি, ১১১ জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ২৬০ সদস্যের আংশিক পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই কমিটির অধীনে দেশের বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিট পুনর্গঠনের কাজ পরিচালিত হয়। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ, বিভিন্ন জেলা, মহানগর, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শতাধিক ইউনিট নতুনভাবে গঠন বা পুনর্গঠন করা হয়।
তবে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দুই বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় ২০২৬ সালের ১ মার্চ বর্তমান কমিটির দায়িত্বকাল শেষ হয়েছে। এরপর থেকেই নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা শুরু করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব।
বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নতুন কমিটির তালিকা ইতোমধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে রয়েছে। আগস্ট মাসে দলীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংগঠনিক ব্যস্ততা থাকায় এ মাসে নতুন কমিটি ঘোষণা করা সম্ভব হচ্ছে না।
দলটির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগস্টজুড়ে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু রয়েছে। সে কারণে নতুন কমিটি ঘোষণার সময় কিছুটা পিছিয়েছে। তবে বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক কার্যক্রম আগস্টের মধ্যেই শেষ হবে এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার সম্ভাবনাই বেশি। বিষয়টি দলীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
ছাত্রদলের নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতার নাম রয়েছে।
আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল, মনজুরুল আলম রিয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খলিল, কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিত, রাজু আহমেদ, মমিনুল ইসলাম জিসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস এবং সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন।
এ ছাড়া সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন আনোয়ার পারভেজ, মো. খোরশেদ আলম সোহেল, এইচ এম আবু জাফর, ইজাজুল কবির রুয়েল, মোস্তাফিজুর রহমান, শরীফ প্রধান শুভ, মাহমুদ ইসলাম কাজল, আজিজুল হক জিয়নসহ আরও কয়েকজন নেতা।
দলীয় সূত্রের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রত্যেক সম্ভাব্য নেতার সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি আবু আফসান মোহাম্মদ ইয়াহইয়া। তিনি এর আগে ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়েও তার পরিচিতি রয়েছে। ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের হামলায় আহত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
এরপর ২০২৩ সালে বিএনপির অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং কারাবরণ করেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ঢাকা মহানগর উত্তর ও পশ্চিম অঞ্চলে ছাত্রদলের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন।
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে শাহবাগ, বাংলামোটর, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন বলে সংগঠন সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে ৫ আগস্টের পর রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচি বাস্তবায়নেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানও সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন।
এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী আন্দোলনের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় দুই মাস কারাগারে ছিলেন।
পরে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগঠনকে সক্রিয় ও সুশৃঙ্খল করার দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন কর্মসূচিতেও সম্পৃক্ত ছিলেন।
বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতও শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় রয়েছেন।
ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে মোট নয়টি মামলা রয়েছে বলে সংগঠন সূত্র জানিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তিনি রিমান্ডে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া দুটি মামলায় সাজাও ভোগ করেছেন। কয়েকটি মামলা এখনও বিচারাধীন রয়েছে।
২০১৫ সালে অবরোধ কর্মসূচির সময় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে পুলিশ তাকে নিচে ফেলে দেয় বলে দলীয় সূত্র দাবি করে। ওই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে প্রায় ১০ মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিল তাকে।
সহ-সভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়ালও সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছেন। ছাত্রদলে তিনি বিভিন্ন সময়ে সহ-স্বাস্থ্য সম্পাদক, এক নম্বর সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার বিরুদ্ধে তিনটি রাজনৈতিক মামলা রয়েছে এবং একবার গ্রেপ্তারও হয়েছেন। বর্তমানে তিনি সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে এফসিপিএস কোর্সে অধ্যয়নরত।
নতুন কমিটি প্রসঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, কমিটি গঠন একটি চলমান সাংগঠনিক প্রক্রিয়া। পদপ্রত্যাশীদের প্রত্যেকেই যোগ্য এবং নেতৃত্ব বাছাইয়ের দায়িত্ব দলের সাংগঠনিক অভিভাবকদের। যাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হবে, তাদের সঙ্গে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। তিনি আরও বলেন, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতা রয়েছে, তবে কোনো ধরনের অসুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।
ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, নতুন কমিটি এমন হওয়া উচিত যারা মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন। একই সঙ্গে সাংগঠনিক দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে অভিজ্ঞতা ও নতুন নেতৃত্বের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কমিটি প্রয়োজন।
যদিও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতার নাম ঘুরে বেড়াচ্ছে, তবুও শেষ পর্যন্ত কারা দায়িত্ব পাবেন, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। দলীয় সূত্র বলছে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই শেষ হওয়ার পরই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি শুধু ছাত্রদলের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডই নয়, বরং আগামী জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে নেতৃত্ব নির্বাচনের বিষয়টি বিএনপির জন্যও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এখন দলীয় নেতাকর্মীদের দৃষ্টি সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে। কারণ ওই সময়েই ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

