নতুন অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই সরকারের নিট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নির্বাহের জন্য এই ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে অর্থবছরের একেবারে শুরুতেই উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ঋণ নেওয়ায় অর্থনীতিবিদরা বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলে সরকারকে পুরো অর্থবছরজুড়েই ব্যাংক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে, যা বেসরকারি খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত দুই অর্থবছরেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩৪৫৭১ কোটি টাকা। সে বছর ৩০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ সেবারও লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ঋণ নিতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো রাজস্ব কম আদায় হওয়া।
সিপিডি -এর সন্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংক ঋণ কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক। তবে রাজস্ব আদায় যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হয়, তাহলে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাজেটে যে পরিমাণ ব্যাংক ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সরকারকে চেষ্টা করতে হবে যেন সেই সীমা অতিক্রম না করে। কারণ অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের বাড়তি ব্যাংক ঋণের পেছনে রাজস্ব ঘাটতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে গত অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ে এত বড় ঘাটতি থাকলে সরকারের সামনে বিকল্প অর্থায়নের পথ সীমিত হয়ে যায়। ফলে ব্যাংকিং খাত থেকেই বেশি ঋণ নিতে হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের দৈনন্দিন ব্যয় থেমে থাকে না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়।
কিন্তু রাজস্ব প্রত্যাশিত হারে না এলে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হয়। তখন সরকার সেই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে।
তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকায় সরকারের নগদ অর্থের প্রয়োজন বেড়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি খাতের জন্য অনুকূল নয়।
যখন সরকার বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তখন ব্যাংকগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের তহবিল সরকারি খাতে চলে যায়। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে।
বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়ে যেতে পারে। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি এড়াতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নয়ন, কর ফাঁকি রোধ এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের নেওয়া মোট ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা।
এই অর্থ নেওয়া হয়েছে ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স’ (Ways and Means Advance) সুবিধার আওতায়।
এটি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি স্বল্পমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থা। সরকারের দৈনিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক অসামঞ্জস্য দেখা দিলে এই সুবিধার মাধ্যমে নগদ অর্থের ঘাটতি পূরণ করা হয়।
অর্থনীতিবিদরা জানান, এটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নয়। সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এর মাধ্যমে সরকারের নগদ অর্থের প্রবাহ সচল রাখা হয়।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার যখন ঋণ গ্রহণ করে, তখন সেটিকে অনেক ক্ষেত্রে নতুন অর্থ সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এটি মূল্যস্ফীতি ও অর্থ সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সরকার শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয় তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকেও ঋণ নিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, সর্বমোট ঋণের মধ্যে ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা নেয়া হয়েছে তফসিলি ব্যাংক থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ঋণের বড় অংশ যখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বহন করে, তখন তাদের ঋণ বিতরণ সক্ষমতা বেসরকারি খাতের ক্ষেত্রে কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
আগের অর্থবছর শেষের দিকে ঋণের পরিমাণ ছিল ৫,৫০,৯০৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
এই বৃদ্ধি মূলত গত অর্থবছরে নেওয়া অতিরিক্ত ঋণের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, সরকারের বাজেট পরিকল্পনা মূলত সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়।
তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা কমাতে হলে রাজস্ব সংগ্রহে দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা ব্যাংক ঋণ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে রাজস্ব আদায় যদি ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকে, তাহলে পুরো অর্থবছরজুড়ে ব্যাংক ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একদিকে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
তাদের মতে, কর আদায় বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো গেলে ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
নতুন অর্থবছরের শুরুতেই ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম ১৩ দিনেই সরকারের নিট ব্যাংক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় নির্বাহের জন্য এই ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে মোট ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে অর্থবছরের একেবারে শুরুতেই উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ঋণ নেওয়ায় অর্থনীতিবিদরা বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হলে সরকারকে পুরো অর্থবছরজুড়েই ব্যাংক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে, যা বেসরকারি খাতের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত দুই অর্থবছরেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে তার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩৪৫৭১ কোটি টাকা। সে বছর ৩০ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।
এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ সেবারও লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ঋণ নিতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো রাজস্ব কম আদায় হওয়া।
সিপিডি -এর সন্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংক ঋণ কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক। তবে রাজস্ব আদায় যদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হয়, তাহলে ঋণের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাজেটে যে পরিমাণ ব্যাংক ঋণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সরকারকে চেষ্টা করতে হবে যেন সেই সীমা অতিক্রম না করে। কারণ অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের বাড়তি ব্যাংক ঋণের পেছনে রাজস্ব ঘাটতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে গত অর্থবছরের তথ্য বিশ্লেষণে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে আদায় হয়েছে মাত্র ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা কম রাজস্ব সংগ্রহ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ে এত বড় ঘাটতি থাকলে সরকারের সামনে বিকল্প অর্থায়নের পথ সীমিত হয়ে যায়। ফলে ব্যাংকিং খাত থেকেই বেশি ঋণ নিতে হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের দৈনন্দিন ব্যয় থেমে থাকে না। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, অবকাঠামো উন্নয়ন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভর্তুকি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়।
কিন্তু রাজস্ব প্রত্যাশিত হারে না এলে নগদ অর্থের সংকট তৈরি হয়। তখন সরকার সেই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে।
তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না থাকায় সরকারের নগদ অর্থের প্রয়োজন বেড়েছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ বেসরকারি খাতের জন্য অনুকূল নয়।
যখন সরকার বড় অঙ্কের ঋণ নেয়, তখন ব্যাংকগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের তহবিল সরকারি খাতে চলে যায়। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে।
বিনিয়োগ কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়ে যেতে পারে। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি এড়াতে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নয়ন, কর ফাঁকি রোধ এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারের নেওয়া মোট ৯ হাজার ২০৯ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৫ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা।
এই অর্থ নেওয়া হয়েছে ‘ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স’ (Ways and Means Advance) সুবিধার আওতায়।
এটি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি স্বল্পমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থা। সরকারের দৈনিক আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক অসামঞ্জস্য দেখা দিলে এই সুবিধার মাধ্যমে নগদ অর্থের ঘাটতি পূরণ করা হয়।
অর্থনীতিবিদরা জানান, এটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ নয়। সাধারণত ৯০ দিনের মধ্যে এই অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এর মাধ্যমে সরকারের নগদ অর্থের প্রবাহ সচল রাখা হয়।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকার যখন ঋণ গ্রহণ করে, তখন সেটিকে অনেক ক্ষেত্রে নতুন অর্থ সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে এটি মূল্যস্ফীতি ও অর্থ সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
সরকার শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয় তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকেও ঋণ নিয়েছেন।
তথ্য অনুযায়ী, সর্বমোট ঋণের মধ্যে ৩ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা নেয়া হয়েছে তফসিলি ব্যাংক থেকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ঋণের বড় অংশ যখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বহন করে, তখন তাদের ঋণ বিতরণ সক্ষমতা বেসরকারি খাতের ক্ষেত্রে কিছুটা সীমিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ব্যাংক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা।
আগের অর্থবছর শেষের দিকে ঋণের পরিমাণ ছিল ৫,৫০,৯০৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।
এই বৃদ্ধি মূলত গত অর্থবছরে নেওয়া অতিরিক্ত ঋণের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, সরকারের বাজেট পরিকল্পনা মূলত সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের ওপর নির্ভর করে তৈরি করা হয়। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আদায় প্রত্যাশার তুলনায় কম হলে ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকারকে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিতে হয়।
তিনি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা কমাতে হলে রাজস্ব সংগ্রহে দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থবছরের শুরুতে কিছুটা ব্যাংক ঋণ নেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে রাজস্ব আদায় যদি ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রার নিচে থাকে, তাহলে পুরো অর্থবছরজুড়ে ব্যাংক ঋণের চাপ আরও বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একদিকে উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
তাদের মতে, কর আদায় বৃদ্ধি, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর ফাঁকি প্রতিরোধ, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো গেলে ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। তথ্য সূত্র: সারাবাংলা

