খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালমন্ত্রীদের পুলিশ প্রটোকল প্রত্যাহার কেন? সরকারের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে বড় কারণ

মন্ত্রীদের পুলিশ প্রটোকল প্রত্যাহার কেন? সরকারের সিদ্ধান্তের নেপথ্যে বড় কারণ

সরকার মনে করছে, রাজধানীর বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এমন নয় যে প্রত্যেক মন্ত্রীর জন্য আলাদা পুলিশ এসকর্ট রাখা অপরিহার্য। তাই যেসব মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই এই সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজধানী ঢাকায় চলাচলের সময় অধিকাংশ মন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ থাকা বিশেষ পুলিশ প্রটোকল বা এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে সরকার জানিয়েছে, রাষ্ট্রের অর্থের সাশ্রয়, পুলিশের জনবলকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের দাবি, এটি কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নয়। বরং ক্ষমতায় আসার আগেই প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তারই অংশ হিসেবে এখন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এই উদ্যোগ। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—কারা এখনও পুলিশ প্রটোকল পাচ্ছেন, কারা হারিয়েছেন এবং এই সিদ্ধান্ত কতদিন কার্যকর থাকবে?

সরকারি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে সব মন্ত্রীর জন্য আলাদা পুলিশ এসকর্ট বজায় রাখা প্রশাসনিকভাবে ব্যয়বহুল এবং জনবল ব্যবস্থাপনায়ও চাপ সৃষ্টি করছিল। প্রতিটি মন্ত্রীর নিরাপত্তায় একটি বিশেষ পুলিশ টিম নিয়োজিত থাকত, যেখানে একজন উপপরিদর্শক (এসআই) এবং চারজন কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করতেন।

শুধু জনবল নয়, এসব টিম পরিচালনার জন্য পুলিশের যানবাহন, জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, খাবার, ভাতা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়ও রাষ্ট্রকে বহন করতে হতো। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই ব্যবস্থার ফলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য থানার নিয়মিত দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতেন, যার প্রভাব পড়ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ তদন্তে।

আরও পড়ুন :  ফাইনালে হার, টিম বাসে আগুন! গুজরাট টাইটান্সের জন্য এক রাতেই নেমে এল দ্বিগুণ দুর্যোগ

সরকার মনে করছে, রাজধানীর বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এমন নয় যে প্রত্যেক মন্ত্রীর জন্য আলাদা পুলিশ এসকর্ট রাখা অপরিহার্য। তাই যেসব মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কেবল তাদের ক্ষেত্রেই এই সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।

নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মাত্র ছয়জন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ঢাকার ভেতরে বিশেষ পুলিশ প্রটোকল পাচ্ছেন।

বর্তমানে এই সুবিধা পাচ্ছেন—

  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
  • স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
  • অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
  • পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
  • সমাজকল্যাণ ও মহিলা-শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন
  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ

এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এই বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা পাচ্ছেন।

অন্যদিকে, সাংবিধানিক ও পদাধিকারবলে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, চিফ হুইপ এবং বিরোধীদলীয় চিফ হুইপও পুলিশ প্রটোকল পেয়ে থাকেন।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৮ জন মন্ত্রীর নিয়মিত পুলিশ এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এই তালিকায় রয়েছেন আইনমন্ত্রী, পানিসম্পদমন্ত্রী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী, পরিবেশমন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী, কৃষি ও মৎস্যমন্ত্রী এবং তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী।

আরও পড়ুন :  বিশ্বকাপ ফাইনালের রেফারি ভিনচিচ: মেসিদের প্রথম হারানো রেফারির হাতেই ফাইনাল

তবে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, তারা সরকারি সফরে ঢাকার বাইরে গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী আবারও পুলিশ প্রটোকল পাবেন।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, শুধু মন্ত্রীদের ক্ষেত্রেই নয়, প্রধানমন্ত্রীও নিজের নিরাপত্তা বহরে পরিবর্তন এনেছেন। প্রধানমন্ত্রীর মূল নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকছে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ)। পাশাপাশি পুলিশের সদস্যসংখ্যাও আগের তুলনায় কমিয়ে আনা হয়েছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই ব্যয় সাশ্রয়ের বার্তা দেওয়া হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার ফলে পুলিশ প্রশাসন সরাসরি বেশ কয়েকটি সুবিধা পাচ্ছে।

প্রথমত, ১৮ জন মন্ত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত প্রায় ৯০ জন পুলিশ সদস্যকে এখন থানা ও মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা সম্ভব হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, পুলিশের গাড়ির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে যেখানে প্রটোকলের জন্য প্রায় ২৫টি গাড়ি ব্যবহৃত হতো, এখন সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র সাতটিতে।

এতে একদিকে যেমন জ্বালানি খরচ কমছে, অন্যদিকে পুলিশের যানবাহনের সংকটও কিছুটা লাঘব হচ্ছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে অপরাধ দমন, টহল বৃদ্ধি এবং মামলার তদন্তে আরও বেশি জনবল ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

সরকারের উপদেষ্টাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রশাসনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। জনগণের করের অর্থ যাতে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, সেজন্য ধাপে ধাপে বিভিন্ন খাতে সংস্কার আনা হচ্ছে।

মন্ত্রীদের পুলিশ প্রটোকল সীমিত করা সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি অংশ মাত্র। ভবিষ্যতেও সরকারি ব্যয় কমাতে আরও কিছু প্রশাসনিক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আরও পড়ুন :  আর্জেন্টিনার দাপুটে জয়, মেসির ঐতিহাসিক রেকর্ড! স্কালোনির ডিফেন্স নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তা

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—এই সিদ্ধান্ত সাময়িক নাকি স্থায়ী?

সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে বহাল থাকবে। অর্থাৎ রাজধানীতে অধিকাংশ মন্ত্রীর জন্য নিয়মিত পুলিশ প্রটোকল আর ফিরিয়ে আনার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই।

তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে কিংবা বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে সরকার ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ রাখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত শুধু ব্যয় সাশ্রয়ের উদ্যোগ নয়; এটি প্রশাসনিক সংস্কারেরও একটি প্রতীকী পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে ভিআইপি নিরাপত্তায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়োজিত থাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সেবা অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ ছিল।

এখন সেই জনবল মাঠপর্যায়ে কাজে লাগানো গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় কমিয়ে রাষ্ট্রের সম্পদের আরও দক্ষ ব্যবহারের সুযোগও তৈরি হবে।

তবে এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, সেটি নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সরকারের ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক নীতির ওপর। আপাতত স্পষ্টভাবে বলা যায়, রাজধানীতে মন্ত্রীদের পুলিশ প্রটোকল সীমিত করার মাধ্যমে সরকার ব্যয় সাশ্রয় ও জনবল ব্যবস্থাপনায় নতুন এক নীতির সূচনা করেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা।