বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। বরিশালে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে তিনি ঘোষণা দেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ২৫ জুলাইয়ের আগে দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে অন্যথায় ঢাকায় বৃহৎ কর্মসূচির ইঙ্গিত দেন।
এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে জামায়াত আসলে কীভাবে সরকারকে ব্যর্থ করতে চায়? দলটির সাংগঠনিক শক্তি কতটা? তারা কি সত্যিই বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার কৌশল?
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই জামায়াতে ইসলামী ধারাবাহিকভাবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে। দলটির দাবি, জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটি কার্যকর করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
ডা. শফিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন এবং নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন রাখতে আগ্রহী নয়। তার অভিযোগ, সরকার আগের শাসনব্যবস্থার ধারা বজায় রাখতে চায় বলেই গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জনগণের দেওয়া রায়কে উপেক্ষা করা হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সংসদের ভেতরে ও রাজপথে—দুই জায়গাতেই আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
বরিশালের সমাবেশে জামায়াতের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
তার বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, প্রয়োজন হলে হরতাল, অবরোধ কিংবা আরও বড় আন্দোলনের পথেও যেতে পারে বিরোধী জোট। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে গণভোট ও জুলাই সনদের পক্ষে প্রচারণা চালানো হলেও পরে সরকার তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখায়নি।
১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াত ইসলামের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের মতে, ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ। যদি জনগণের দেওয়া গণভোটের রায় বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে জনগণই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াত সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও আন্দোলন চালিয়ে যাবে। তিনি দাবি করেন, জনগণের অংশগ্রহণেই সরকারকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে বাধ্য করা সম্ভব।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, জামায়াত সরাসরি সরকার পতনের ঘোষণা না দিয়ে জনমত ও গণআন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল গ্রহণ করতে চাইছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বিরোধী দলের কাজই সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা এবং বিকল্প অবস্থান তুলে ধরা। তবে সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করলেও সেটিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজের মতে, গণভোটের প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বক্তব্য দিচ্ছে। তার দাবি, রাষ্ট্রপতির নামে জারি হওয়া সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বিদ্যমান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জামায়াতের বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাস্তবে দলটির সেই মাত্রার সাংগঠনিক সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো সরকারকে বড় ধরনের চাপে ফেলতে হলে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো। দ্বিতীয়ত, ব্যাপক জনসমর্থন। তৃতীয়ত, বিরোধী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য। চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন পরিচালনার সক্ষমতা।
জামায়াত বর্তমানে ১১ দলীয় জোটের অংশ হলেও জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের আন্দোলন সফল করতে অন্যান্য বিরোধী শক্তির সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা সমাবেশ দিয়ে সরকারকে চাপে ফেলা সম্ভব হলেও তা সরকারকে কার্যত ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হবে কি না, সেটি সময়ই বলে দেবে।
জামায়াত আমিরের বক্তব্য নিয়ে বিএনপির ভেতরেও ভিন্নধর্মী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
সরকারদলীয় হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজাম বলেন, রাজনৈতিক সমাবেশে নেতারা বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দেন। তার মতে, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সংসদকে কার্যকর রাখাই হওয়া উচিত সবার লক্ষ্য।
অন্যদিকে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বিষয়টিকে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই দেখছেন। তার মতে, বিরোধীদলীয় নেতা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর ভাষা ব্যবহার করতেই পারেন। তবে সেই বক্তব্য যেন রাজনৈতিক সৌজন্যের সীমা অতিক্রম না করে, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, সরকার গণভোটসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করলেও বিরোধী দল সেটিতে আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক অবিশ্বাস আরও গভীর হচ্ছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রশ্নে এখন সরকার ও বিরোধী জোটের অবস্থান স্পষ্টভাবে ভিন্ন। একদিকে বিরোধীরা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি তুলছে, অন্যদিকে সরকারের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যু আগামী কয়েক মাস দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। বিশেষ করে ধারাবাহিক সমাবেশ, রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং সম্ভাব্য আন্দোলন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও সেটিকে সফল আন্দোলনে পরিণত করা অনেক বেশি কঠিন।
একটি আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করে জনসম্পৃক্ততা, বিরোধী জোটের ঐক্য, সাংগঠনিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। ফলে জামায়াতের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তথ্য সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

