মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত ক্রমেই আরও গভীর হচ্ছে। সাম্প্রতিক মার্কিন বিমান হামলার পর এবার মধ্যপ্রাচ্যে ২০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে হরমুজ প্রণালী এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ জলসীমায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে ইরান এই পদক্ষেপকে সরাসরি উসকানিমূলক বলে উল্লেখ করেছে এবং স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে তারা নতি স্বীকার করবে না।
মঙ্গলবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় দীর্ঘ সাত ঘণ্টাব্যাপী বিমান হামলা চালায়। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই অভিযানে হরমুজ প্রণালীর আশপাশে অবস্থিত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন ভাণ্ডার, উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ ধ্বংস করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের মতে, এই অভিযান ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে সম্ভাব্য হুমকি কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় ২০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি শত শত যুদ্ধবিমান সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে।
সেন্টকমের বক্তব্য অনুযায়ী, এই বাহিনী যে কোনও সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। হরমুজ প্রণালীসহ গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে মার্কিন উপস্থিতি আরও জোরদার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মোতায়েন কেবল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের জন্য নয়; বরং ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ঠেকানোর কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়লেও নিজেদের অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি তেহরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও ধরনের আলোচনা হবে না।
তাদের দাবি, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ও চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখবে, ততক্ষণ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে এই অঞ্চলে যে কোনও ধরনের উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ তোলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সামরিক হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটন নিজেরাই কূটনৈতিক প্রক্রিয়া নষ্ট করেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার টেবিলে ফেরার কোনও সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, ইরান কূটনীতির পথ কখনও প্রত্যাখ্যান করেনি। বরং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপই আলোচনার পরিবেশ ধ্বংস করেছে।
ঘারিবাবাদি আরও জানান, ভবিষ্যতে যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে অবরোধ আরোপ করে, তবুও তেহরান তাদের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করবে না।
তার দাবি, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের কৌশলগত প্রভাব অব্যাহত থাকবে এবং দেশের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষায় সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
মার্কিন সামরিক অভিযানের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি তেহরান কোনও সমঝোতায় না আসে, তাহলে আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আরও হামলা চালানো হতে পারে।
এই বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ উভয় পক্ষের অবস্থান ক্রমেই আরও কঠোর হয়ে উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে যদি দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। কূটনৈতিক মহলের আশা, সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই উভয় পক্ষ সংযম দেখাবে এবং আলোচনার পথ আবারও উন্মুক্ত হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে শক্ত অবস্থান দেখাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনও ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত যদি আরও বাড়ে, তাহলে শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, দুই দেশের সম্পর্ক এখন এক অত্যন্ত সংকটপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানের ব্যাপক মোতায়েন এবং ইরানের অনড় অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনা কতদূর গড়ায়, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশ্বের নজর এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

