খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeস্পোটস ওয়ার্ল্ডফিফা বিশ্বকাপ স্পেশালপেদ্রির এক পোস্টে লুকিয়ে ছিল বিশ্বকাপের স্বপ্ন! ফ্রান্সকে হারিয়ে সত্যি করল স্পেন

পেদ্রির এক পোস্টে লুকিয়ে ছিল বিশ্বকাপের স্বপ্ন! ফ্রান্সকে হারিয়ে সত্যি করল স্পেন

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে গেছে স্পেন। এই জয়ের মাধ্যমে টানা তৃতীয়বার বড় কোনো নকআউট ম্যাচে ফরাসিদের বিদায় করল ‘লা রোহা’।

স্পেনের বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠা শুধুই একটি জয় নয়, এটি দীর্ঘ পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন প্রজন্মের অদম্য বিশ্বাসের প্রতিফলন। ১৩ মাস আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা একটি পোস্ট আজ যেন ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হয়েছে। বার্সেলোনার মিডফিল্ডার পেদ্রি তখনই একটি বিশেষ তারিখ উল্লেখ করেছিলেন—১৯ জুলাই ২০২৬। সেই দিনটিই এখন বিশ্বকাপ ফাইনালের দিন, আর স্পেন ঠিক সেই মঞ্চেই খেলতে নামছে।

২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে পর্তুগালের কাছে হেরে হতাশ হয়েছিল স্পেন। তবে সেই পরাজয় তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়নি। বরং সেটিই হয়ে ওঠে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা।

ফাইনালের পর পেদ্রি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লামিনে ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের সঙ্গে একটি ছবি প্রকাশ করেন। ছবির ক্যাপশনে ছিল শুধু একটি তারিখ—১৯.০৭.২৬। তখন অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কারণ সামনে ছিল দীর্ঘ পথ—বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব, কঠিন মূল আসর এবং নকআউটের লড়াই।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পোস্টের গুরুত্ব স্পষ্ট হতে শুরু করে। বিশেষ করে লামিনে ইয়ামাল যখন সেটি নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে শেয়ার করেন, তখন বোঝা যায় স্পেনের তরুণ ফুটবলাররা অনেক আগেই নিজেদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে রেখেছিলেন।

আজ সেই পোস্ট আবারও ভাইরাল। কারণ স্বপ্নের তারিখ এখন বাস্তব।

বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শক্তিশালী ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে গেছে স্পেন। এই জয়ের মাধ্যমে টানা তৃতীয়বার বড় কোনো নকআউট ম্যাচে ফরাসিদের বিদায় করল ‘লা রোহা’।

শুরু থেকেই ম্যাচে আধিপত্য দেখায় স্পেন। বল দখল, আক্রমণ গঠন এবং রক্ষণ—সব বিভাগেই তারা ছিল অনেক বেশি সংগঠিত। ফলে কিলিয়ান এমবাপে, উসমান দেম্বেলে এবং মাইকেল ওলিসের মতো তারকাদের নিয়ে সাজানো ফরাসি আক্রমণভাগ কার্যত নিষ্প্রভ হয়ে পড়ে।

স্প্যানিশ রক্ষণ পুরো ম্যাচজুড়ে এমন শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলেছে যে ফ্রান্স একবারও গোলের দেখা পায়নি।

ম্যাচের আগেই লামিনে ইয়ামাল বলেছিলেন, ফ্রান্সেরই স্পেনকে ভয় পাওয়া উচিত। কারণ সাম্প্রতিক দুই বড় টুর্নামেন্টে স্প্যানিশরাই ফরাসিদের শিরোপার স্বপ্ন ভেঙেছে।

অনেকেই এটিকে তরুণ ফুটবলারের আত্মবিশ্বাসী মন্তব্য বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঠে নেমে তিনি প্রমাণ করেছেন, কথাগুলো ছিল বাস্তবতার প্রতিফলন।

প্রথমার্ধে স্পেন যে পেনাল্টি পায়, তার পেছনেও ছিল ইয়ামালের অসাধারণ মুভমেন্ট। ডি-বক্সের ভেতরে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস ডিগনি ইয়ামালকে ফাউল করলে রেফারি পেনাল্টির নির্দেশ দেন।

সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিকেল ওয়ারজাবাল স্পেনকে এগিয়ে দেন। পরে ইয়ামাল নিজেও দারুণ এক গোল করেছিলেন। যদিও ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্তে সেটি অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।

ম্যাচ শেষে মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই তারকা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, “আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, আমরাই বিশ্বের সেরা দল।”

২০২৪ সালের ইউরো জয়ের পর থেকেই দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে স্পেন। নেশনস লিগের ফাইনালে পরাজয় এলেও সেই ব্যর্থতা দলকে আরও পরিণত করেছে।

বিশ্বকাপে শুরু থেকেই স্পেনের ফুটবল ছিল পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত। প্রতিটি ম্যাচে তারা নিজেদের কৌশল কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করেছে। বল দখল থেকে শুরু করে আক্রমণ সাজানো—সব ক্ষেত্রেই স্প্যানিশরা প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

এই ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই তাদের বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে এসেছে।

স্পেনের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি পেদ্রির অসাধারণ মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ। টুর্নামেন্টের শুরুতে তিনি মাঝমাঠ থেকে খেলার গতি নির্ধারণ করেছেন এবং আক্রমণ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

কোয়ার্টার ফাইনালের আগে প্রতিপক্ষের ফাইনাল থার্ডে সবচেয়ে বেশি সফল পাস দেওয়ার রেকর্ডও ছিল তাঁর দখলে।

পরবর্তী সময়ে ফাবিয়ান রুইজ প্রথম একাদশে নিয়মিত সুযোগ পেলেও পেদ্রি এখনও কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রয়োজন অনুযায়ী তাঁর অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা দলের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্পেনের বর্তমান সাফল্যের বড় কৃতিত্ব অবশ্যই প্রধান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের।

তাঁর অধীনে দলটি শুধু প্রতিভাবান ফুটবলারদের সমন্বয়ই করেনি, বরং একটি স্পষ্ট কৌশলগত পরিচয়ও তৈরি করেছে। তরুণ ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ভারসাম্য, দ্রুত পাসিং ফুটবল এবং শক্তিশালী রক্ষণ—সব মিলিয়ে স্পেন আবারও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলে পরিণত হয়েছে।

কোচ নিজেও জানিয়েছেন, তাঁর দল ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনের মানসিকতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

ফ্রান্সকে হারানোর মাধ্যমে শুধু ফাইনাল নিশ্চিত করেনি স্পেন, গড়েছে একাধিক নজিরও।

বর্তমানে তারা টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত, যা ইতালির ঐতিহাসিক রেকর্ডের সমান।

এছাড়া ইউরোপের প্রথম দল হিসেবে ইউরো ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে টানা আটটি নকআউট ম্যাচ জয়ের অনন্য কীর্তিও গড়েছে স্প্যানিশরা।

এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, বর্তমান সময়ে স্পেন বিশ্বের সবচেয়ে ধারাবাহিক ও সফল জাতীয় দলগুলোর একটি।

স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে ২০১০ সালের বিশ্বকাপ জয় ছিল সোনালি অধ্যায়। দীর্ঘ ১৬ বছর পর সেই গৌরব আবারও ফিরিয়ে আনার সুযোগ এসেছে।

তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল, অভিজ্ঞ পেদ্রি, নিকো উইলিয়ামস, ফাবিয়ান রুইজ, মিকেল ওয়ারজাবালসহ পুরো দল এখন আত্মবিশ্বাসে উজ্জীবিত।

১৩ মাস আগে একটি পোস্টে যে স্বপ্নের তারিখ লেখা হয়েছিল, আজ সেটিই বাস্তবের মঞ্চ। এখন দেখার বিষয়, সেই স্বপ্ন পূর্ণতা পায় কি না। যদি ফাইনালেও নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারে, তবে স্পেনের নতুন সোনালি যুগের সূচনা হতে পারে এই বিশ্বকাপ থেকেই।