খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বাংলাদেশিদের অভিবাসী ভিসা কেন স্থগিত করল জানাল মার্কিন দূতাবাস

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অভিবাসী (ইমিগ্র্যান্ট) ভিসা প্রদান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করেছে ঢাকায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস। দূতাবাসের ভাষ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালরাজনীতিসাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে শোকের ছায়া

সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে শোকের ছায়া

শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স) ও এমএ সম্পন্ন করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চতর আইন শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়ে লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল সনদ লাভ করেন।

বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনীতিক, সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। রোববার (১২ জুলাই) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ৯৫ বছর। দেশের রাজনীতি, আইন এবং সংসদীয় গণতন্ত্রে তার দীর্ঘ অবদান জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুর খবর প্রথম নিশ্চিত করেন তার কনিষ্ঠ পুত্র নওফেল জমির। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক আবেগঘন পোস্টে তিনি জানান, ফজরের সময় তার শ্রদ্ধেয় পিতা মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে ইন্তেকাল করেছেন।

এদিকে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, সাবেক স্পিকার, সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, মরহুমের জানাজার নামাজ এবং দাফনের সময়সূচি পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরবর্তীতে ঘোষণা করা হবে। এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স ছিলেন একজন সুপরিচিত জোতদার।

শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে বিএ (অনার্স) ও এমএ সম্পন্ন করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চতর আইন শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়ে লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল সনদ লাভ করেন।

১৯৬০ সালের ২৭ মে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন বিষয়ে দক্ষ আইনজীবী হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া আইনজীবীদের অন্যতম ছিলেন। স্বাধীনতার পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থান এবং পেশাগত ভূমিকা দেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন জমির উদ্দিন সরকার। ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়। পরে ছাত্র ইউনিয়ন এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন এবং মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে গঠিত জাগদলে যোগ দেন। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দলটির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে পাঁচবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ভূমি প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বিশেষ করে আইনমন্ত্রী থাকাকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় বিল প্রণয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন।

রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। সেই সময় তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

জমির উদ্দিন সরকার একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯১ সালে ঢাকা-৯ আসন থেকে বিজয়ী হন।

পরবর্তীতে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে টানা তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এলাকার উন্নয়নে কাজ করেন। এছাড়া ২০০৯ সালে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনেও বিজয় অর্জন করেন।

রাজনীতি এবং আইন পেশার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদানও উল্লেখযোগ্য। নিজ জন্মস্থান পঞ্চগড়ে তিনি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কলেজিয়েট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন, যা স্থানীয় শিক্ষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এছাড়া আইন, সংসদীয় গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে তার লেখা একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এসব বই শিক্ষার্থী, গবেষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য মূল্যবান তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হয়।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের স্ত্রী নূর আখতার ২০২৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা নিলুফার জমির এবং দুই পুত্র নওশাদ জমির ও নওফেল জমির রেখে গেছেন।

তার বড় ছেলে নওশাদ জমির বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং পঞ্চগড়-১ আসন থেকে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আইনজীবী, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, স্পিকার এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি—প্রতিটি ভূমিকায় তিনি দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষা, আইন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

দীর্ঘ কর্মময় জীবনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিজের নাম স্থায়ীভাবে লিখে গেছেন। তার অবদান আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।