খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeঅর্থ-বানিজ্যঅ্যাপল-ইন্টেল জোটে বদলে যেতে পারে চিপ ইন্ডাস্ট্রি! ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে নতুন বিতর্ক

অ্যাপল-ইন্টেল জোটে বদলে যেতে পারে চিপ ইন্ডাস্ট্রি! ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে নতুন বিতর্ক

সরকার যখন এত বড় বিনিয়োগ করেছে, তখন ইন্টেলের জন্য বড় কোনো গ্রাহক নিশ্চিত করা তাদের জন্য স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ ক্রেতা হিসেবে অ্যাপলের সঙ্গে সম্ভাব্য উৎপাদন চুক্তি সেই লক্ষ্য পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

বিশ্ব প্রযুক্তি খাতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে অ্যাপল। নতুন এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টরের ওপর সম্ভাব্য ১০০ শতাংশ আমদানি শুল্ক থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু বিপুল বিনিয়োগই নয়, ইন্টেলের সঙ্গে সম্ভাব্য উৎপাদন চুক্তিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ বিস্তারিত মন্তব্য করেনি, তবুও সাম্প্রতিক তথ্য প্রযুক্তি শিল্পে নতুন জল্পনার জন্ম দিয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টরের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা তৈরি হলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি এই বিশাল শুল্কের আওতা থেকে অব্যাহতি পায়।

প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রে শত শত বিলিয়ন ডলারের উৎপাদন ও অবকাঠামো বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির কারণেই অ্যাপল এই সুবিধা অর্জন করেছে। তবে নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ থাকতে পারে—ইন্টেলের সঙ্গে চিপ উৎপাদন সংক্রান্ত একটি সম্ভাব্য সমঝোতা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাপলের বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা। তবে আলোচনায় ইন্টেলের উৎপাদন সক্ষমতাও বিশেষ গুরুত্ব পায়। সরকারি সূত্রের দাবি, অ্যাপলকে তাদের কিছু চিপ ইন্টেলের উৎপাদন কারখানায় তৈরি করার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছিল।

এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চিপ উৎপাদনই শক্তিশালী হতো না, একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পের ওপর সরকারের বিনিয়োগও আরও কার্যকর বলে প্রমাণিত হতো।

ঘটনাগুলোর সময়কালও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ঠিক একই সময়ে মার্কিন সরকার ইন্টেলের সাধারণ শেয়ারে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকার কোম্পানিটির প্রায় ১০ শতাংশ মালিকানাও অর্জন করে।

সরকার যখন এত বড় বিনিয়োগ করেছে, তখন ইন্টেলের জন্য বড় কোনো গ্রাহক নিশ্চিত করা তাদের জন্য স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিপ ক্রেতা হিসেবে অ্যাপলের সঙ্গে সম্ভাব্য উৎপাদন চুক্তি সেই লক্ষ্য পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।

পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, অ্যাপল তাদের কিছু পণ্যের জন্য ইন্টেল থেকে চিপ সংগ্রহ করবে।

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে চিপ ডিজাইন ও উৎপাদন বাড়ানোর স্বার্থেই তিনি ইন্টেলকে সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এই ঘোষণার পর ইন্টেলের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একইভাবে সরকারের বিনিয়োগ ঘোষণার পরও কোম্পানিটির শেয়ারের মূল্য বেড়েছিল। ফলে এই চুক্তিকে অনেকেই সরকারের বিনিয়োগকে সফল দেখানোর একটি কৌশল হিসেবেও দেখছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ইন্টেলের সঙ্গে সম্ভাব্য এই উৎপাদন সহযোগিতা বড় খবর হলেও অ্যাপলের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিকল্পনার তুলনায় এটি খুব বড় অংশ নয়।

অ্যাপল ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন খাতের উন্নয়নে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই বিশাল পরিকল্পনার তুলনায় ইন্টেলের কাছ থেকে কিছু চিপ উৎপাদন করানো অপেক্ষাকৃত ছোট একটি উদ্যোগ।

তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি হতে পারে।

এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি ইন্টেল ঠিক কোন ধরনের অ্যাপল চিপ উৎপাদন করবে।

প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, এটি ম্যাক কম্পিউটারের জন্য ব্যবহৃত অ্যাপল সিলিকন প্রসেসর হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাপলের বিভিন্ন ডিভাইসে প্রসেসর ছাড়াও অসংখ্য ধরনের সেমিকন্ডাক্টর ও কন্ট্রোলার ব্যবহৃত হয়। তাই ইন্টেল হয়তো মূল প্রসেসরের পরিবর্তে অন্যান্য সহায়ক চিপও তৈরি করতে পারে।

এতে অ্যাপলের উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং উৎপাদন সক্ষমতা আরও স্থিতিশীল হতে পারে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক মিং-চি কুও চলতি বছরের মে মাসে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিলেন, ইন্টেল ইতোমধ্যেই অ্যাপলের জন্য কিছু চিপ উৎপাদনের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু করেছে।

তার তথ্য অনুযায়ী, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৭ সাল থেকে এসব চিপের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে পারে।

যদিও অ্যাপল কিংবা ইন্টেল এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি, তবুও প্রযুক্তি শিল্পে এই সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে বিশ্বজুড়ে উন্নতমানের চিপের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি ইতোমধ্যেই অসংখ্য বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অর্ডারে ব্যস্ত। ফলে উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপও বেড়েছে।

এই পরিস্থিতিতে অ্যাপলের জন্য বিকল্প উৎপাদন অংশীদার থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টেলের আধুনিক উৎপাদন কারখানা ব্যবহার করতে পারলে অ্যাপল ভবিষ্যতে সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারবে।

এছাড়া একাধিক উৎপাদন অংশীদার থাকলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও আরও স্থিতিশীলতা আসে।

এই সম্ভাব্য চুক্তি শুধু অ্যাপল ও ইন্টেলের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শিল্পের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, বিদেশি নির্ভরতা কমানো এবং উন্নত সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে শক্তিশালী করার যে পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়ন করছে, অ্যাপল-ইন্টেল সহযোগিতা সেই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হতে পারে।

একই সঙ্গে সরকারের বিপুল বিনিয়োগেরও বাস্তব সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

প্রযুক্তি খাতের প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, ততই বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ ব্যবস্থা আরও বৈচিত্র্যময় করার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অ্যাপলের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

যদি ইন্টেলের সঙ্গে উৎপাদন সহযোগিতা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু সম্ভাব্য শুল্ক ঝুঁকি কমাবে না, বরং ভবিষ্যতের এআই যুগে চিপ সরবরাহ নিশ্চিত করতেও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সব মিলিয়ে, সম্ভাব্য এই অংশীদারিত্ব একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পনীতি ও অর্থনৈতিক কৌশলকে শক্তিশালী করবে, অন্যদিকে অ্যাপলের দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন পরিকল্পনাকেও আরও নিরাপদ ও কার্যকর করে তুলতে পারে। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ না এলেও প্রযুক্তি শিল্পের দৃষ্টি এখন অ্যাপল, ইন্টেল এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নিবদ্ধ।