খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর উদ্যোগ: কারা পাবেন?

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার...
Homeবাংলা নিউজ স্পেশালজাতীয়সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর উদ্যোগ: কারা পাবেন?

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর উদ্যোগ: কারা পাবেন?

স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহের মাধ্যমে কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমানোর লক্ষ্যেই রেশন সুবিধা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে নীতিগত পর্যায়ে আলোচনা এগিয়েছে এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অর্থ বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। ফলে সরকারি কর্মচারীদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আলোচনায় রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে সীমিত বেতনে চলা বহু সরকারি কর্মচারী সংসার পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছেন। অনেকেই ঋণ, ধার-দেনা এবং বাড়তি আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন।

সরকারের মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই আর্থিক চাপ শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই নয়, কর্মক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মানসিক চাপ বাড়ায় দায়িত্ব পালনে মনোযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাই স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সরবরাহের মাধ্যমে কর্মচারীদের আর্থিক চাপ কমানোর লক্ষ্যেই রেশন সুবিধা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

১২ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের রেশন সুবিধার বিষয়টি প্রথম গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জন্য রেশন ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে অনেকেই আর্থিক সংকটে ভুগছেন। রেশন সুবিধা চালু হলে তাদের জীবনযাত্রা কিছুটা সহজ হবে এবং কর্মদক্ষতাও বৃদ্ধি পাবে।

প্রস্তাবটি বিবেচনার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অর্থ বিভাগের সচিবকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানাতে হবে।

এ ছাড়া প্রতি তিন মাস অন্তর অনুষ্ঠিত সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এই উদ্যোগের অগ্রগতি উপস্থাপন করতে হবে। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, সরকার বিষয়টিকে প্রশাসনিকভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রেখেছে।

বর্তমান প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রেশন সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই গ্রেডগুলোর কর্মচারীরা সাধারণত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে পরিচিত। তাদের বেতন তুলনামূলক কম হওয়ায় মূল্যস্ফীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে।

সরকারি চাকরির ১২তম গ্রেডে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও কারিগরি পদ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—

অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক
হিসাব সহকারী বা ক্যাশিয়ার
সাঁট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর
গুদামরক্ষক
নিরাপত্তা পরিদর্শক
ডাটা এন্ট্রি সুপারভাইজার
অডিটর
জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর

এই পদগুলোতে কর্মরত কর্মকর্তারা প্রস্তাবিত রেশন সুবিধার আওতায় আসতে পারেন।

২০তম গ্রেড সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন স্তর। সাধারণত এসএসসি বা সমমান শিক্ষাগত যোগ্যতায় এসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এই গ্রেডের উল্লেখযোগ্য পদগুলো হলো—

অফিস সহায়ক
নিরাপত্তা প্রহরী
নৈশপ্রহরী
পিয়ন
মালী
ঝাড়ুদার
পরিচ্ছন্নতাকর্মী

প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে এই কর্মচারীরাও রেশন সুবিধা পাবেন।

বর্তমানে সরকারের নির্ধারিত রেশন সুবিধা সীমিত সংখ্যক সরকারি সংস্থার সদস্যদের জন্য চালু রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

সশস্ত্র বাহিনী
বাংলাদেশ পুলিশ
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী
কারা অধিদপ্তর
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই)
স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

এই সংস্থাগুলোর সদস্যরা সরকার নির্ধারিত সুলভ মূল্যে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য সংগ্রহের সুযোগ পান।

উদাহরণ হিসেবে পুলিশ সদস্যদের চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য মাসিক রেশন বরাদ্দে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে—

২০ কেজি চাল
২০ কেজি আটা
২ কেজি ডাল
সাড়ে ৪ লিটার সয়াবিন তেল
২ কেজি চিনি

যদি নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়, তাহলে একই ধরনের বা সরকার নির্ধারিত নতুন কাঠামোর ভিত্তিতে রেশন সুবিধা দেওয়া হতে পারে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সরকারি কর্মচারীদের জন্য সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়ার মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির সময়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা চালু করা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে তাদের আর্থিক চাপ কমবে এবং দায়িত্ব পালনে আরও মনোযোগী হওয়া সম্ভব হবে।

তিনি আরও মনে করেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে অসন্তোষ কমবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, রেশন বিতরণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃত উপকারভোগীরা সুবিধা না পেলে কিংবা অনিয়ম দেখা দিলে এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি কর্মচারীরা রেশন সুবিধাসহ বিভিন্ন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন করেন। সেই সময় খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম রেশন সুবিধার পক্ষে মত দিয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠান। এরপর থেকেই বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়।

বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে। অর্থ বিভাগকে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে এবং বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়েও কাজ হচ্ছে।

যদিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা কার্যকর তারিখ ঘোষণা করা হয়নি, তবে প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং নীতিগত সম্মতি বিবেচনায় বলা যায়, ১২ থেকে ২০ গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন সুবিধা চালুর প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে।
সূত্র: বাসস