খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশে টানা ভারী বর্ষণ ও বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় দ্রুত ও সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের নিরাপত্তা,...
Homeঅর্থ-বানিজ্যশেয়ারবাজারে আসছে সরকারি প্রতিষ্ঠান: আস্থা ফিরবে নাকি হতাশা?

শেয়ারবাজারে আসছে সরকারি প্রতিষ্ঠান: আস্থা ফিরবে নাকি হতাশা?

পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে, বাজারের গভীরতা বাড়বে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘদিনের হারানো আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজার নানা সংকটে জর্জরিত। বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি, শেয়ার কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সুশাসনের অভাব এবং শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানির স্বল্পতা বাজারকে কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে দেয়নি। ফলে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারী বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে অর্থনীতিবিদ ও বাজার-সংশ্লিষ্টরা ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে, বাজারের গভীরতা বাড়বে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দীর্ঘদিনের হারানো আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুঁজিবাজার উন্নয়নের জন্য ১৭ দফা অগ্রাধিকার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এই কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ।

এর পাশাপাশি বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা, শেয়ার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার, কর-সুবিধা প্রদান এবং সার্বিক বাজার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজার আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো বড় মূলধনের এবং উচ্চমানের কোম্পানির স্বল্পতা। বর্তমানে তালিকাভুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠানের বাজারমূলধন সীমিত এবং কয়েকটির আর্থিক ভিত্তিও খুব শক্তিশালী নয়। ফলে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বা বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে পান না।

অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস, টেলিযোগাযোগ, সার এবং অবকাঠামো খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিত মুনাফা করে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল আয় ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ যদি শেয়ারবাজারে আসে, তাহলে বাজারের গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি ভালো কোম্পানি শুধু নতুন শেয়ার যোগ করে না, বরং পুরো বাজারের গ্রহণযোগ্যতা এবং বিনিয়োগযোগ্যতা বাড়িয়ে তোলে।

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অনেক আগেই শেয়ারবাজারে আনা উচিত ছিল।

তার মতে, যদিও উদ্যোগটি কিছুটা দেরিতে এসেছে, তবুও এটি বাস্তবায়িত হলে পুঁজিবাজারে নতুন গতি আসবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি আরও বলেন, অতীতেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময় রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনার পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছিল। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একই উদ্যোগকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

আবু আহমেদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে বাজারের স্থিতিশীলতা বাড়বে, নতুন মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ার যুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও করপোরেট সুশাসন আরও শক্তিশালী হবে।

গত এক দশকেরও বেশি সময়ে শেয়ারবাজারে একাধিক কেলেঙ্কারি, মূল্য কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে লাখো বিনিয়োগকারী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ফলে বাজারের প্রতি মানুষের বিশ্বাস উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান বাজারে এলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক কম ঝুঁকির বিকল্প পাবেন। নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানকারী এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই আস্থা ফিরে আসবে না; বাজারে মানসম্পন্ন কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতের আধিপত্য রয়েছে। অথচ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক অর্থনৈতিক খাত এখনো পর্যাপ্তভাবে প্রতিনিধিত্ব করছে না।

যদি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কিংবা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের মতো বড় প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়, তাহলে বাজারে নতুন খাতের অন্তর্ভুক্তি ঘটবে।

এর ফলে বাজারমূলধন বৃদ্ধি পাবে, প্রতিদিনের লেনদেন বাড়বে, বড় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক তহবিল বিনিয়োগে আগ্রহী হবে এবং কয়েকটি কোম্পানির ওপর সূচকের অতিরিক্ত নির্ভরতাও কমে আসবে।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি অংশের শেয়ার বিক্রি করা মানেই রাষ্ট্রীয় মালিকানা হারানো নয়। সরকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেই সাধারণ জনগণকে অংশীদার হওয়ার সুযোগ দিতে পারে।

এতে সরকারের জন্য একাধিক সুবিধা সৃষ্টি হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের বাজারভিত্তিক মূল্যায়ন সম্ভব হবে, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হবে, বাজেটে অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহ করা সহজ হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে।

তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার ফলে করপোরেট সুশাসনও আরও কার্যকর হবে।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বড়, স্বচ্ছ এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন। যদি রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো খাতের শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে আসে, তাহলে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে এটি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে। ফলে আন্তর্জাতিক মানের আরও কোম্পানি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু সরকারি কোম্পানিকে বাজারে আনলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথমত, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত করপোরেট পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

চতুর্থত, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার, শেয়ার কারসাজি এবং কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এসব বিষয় নিশ্চিত না হলে ভালো কোম্পানিও বাজারে এসে প্রত্যাশিত ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবে না।

বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে প্রায় ২২টি সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সীমিত এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও আশানুরূপ নয়।

অন্যদিকে তিতাস গ্যাস, পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছে।

সরকার ইতোমধ্যে আরও কয়েকটি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি কর-সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।