কলকাতা পুলিশের প্রশাসনিক কাঠামোতে আবারও বড়সড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। লালবাজারের নির্দেশে ওসি ও অতিরিক্ত ওসি-সহ মোট ৩৩ জন ইন্সপেক্টরের দায়িত্বে রদবদল করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে শহরের প্রায় ২০টি থানায় নতুন নেতৃত্ব এসেছে। তবে এই রদবদলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, দীর্ঘ ১৬ বছর পর কলকাতার দুটি থানার দায়িত্ব একসঙ্গে দুই মহিলা অফিসারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক মহলে এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী উত্তর কলকাতার সিঁথি থানার নতুন অফিসার-ইন-চার্জ (ওসি) হয়েছেন চামেলি মুখোপাধ্যায়। তিনি এর আগে উল্টোডাঙা মহিলা থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া নির্বাচনের আগে কিছু সময়ের জন্য কালীঘাট থানার ওসির দায়িত্বও সামলেছিলেন।
অন্যদিকে, দক্ষিণ কলকাতার চেতলা থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মৌসম চট্টোপাধ্যায়। একই সঙ্গে টালিগঞ্জ মহিলা থানার ওসি রূপা সিংকে সরশুনা থানার ওসি হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এই নিয়োগগুলি কলকাতা পুলিশের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করেছে বলে মনে করছেন প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা।
লালবাজারের জারি করা নির্দেশ অনুযায়ী শুধু মহিলা অফিসারদেরই নয়, আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ থানায় নতুন ওসি নিয়োগ করা হয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এই রদবদল করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন—
- সিঁথি থানার ওসি: চামেলি মুখোপাধ্যায়
- চেতলা থানার ওসি: মৌসম চট্টোপাধ্যায়
- সরশুনা থানার ওসি: রূপা সিং
- ভবানীপুর থানার ওসি: রাজীব চট্টোপাধ্যায়
- পার্ক স্ট্রিট থানার ওসি: অমিত চট্টোপাধ্যায়
- ভাঙড় থানার ওসি: গৌতম রুজ
এছাড়া আরও বেশ কয়েকটি থানায় নতুন অফিসারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এই রদবদলের অংশ হিসেবে ভবানীপুর থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন রাজীব চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে, ভবানীপুর থানার ইন্সপেক্টর সৌমিত্র বসুকে স্থানান্তর করা হয়েছে স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ দায়িত্ব পালনকারী সংস্থাগুলিতেও এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। ফলে কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক স্তরে ধারাবাহিকভাবে রদবদল চলছে। কলকাতা পুলিশে এটি দ্বিতীয় বড় প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতেই কলকাতা পুলিশের রিজার্ভ ফোর্সের ডেপুটি কমিশনার জাফর আজমল কিদওয়াইকে পদোন্নতি দিয়ে জয়েন্ট পুলিশ কমিশনার করা হয়েছে। একই সময়ে কলকাতা পুলিশের এসটিএফের ডেপুটি কমিশনার প্রদীপ কুমার যাদবকে চতুর্থ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলি প্রশাসনের শীর্ষস্তরে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার অংশ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
কলকাতা পুলিশের এই পরিবর্তনের আগে রাজ্য সরকারও বড় প্রশাসনিক রদবদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নবান্নের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী একসঙ্গে ১০৮ জন থানার আইসিকে বদলি করা হয়। রাজ্যের বিভিন্ন জেলার থানায় নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগের মাধ্যমে পুলিশ প্রশাসনে নতুন কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় সংখ্যায় একসঙ্গে বদলি সাধারণত প্রশাসনিক পুনর্গঠন, কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার উদ্দেশ্যেই করা হয়।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রশাসনে দ্রুত পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
সরকার গঠনের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই পুলিশ প্রশাসনে ধারাবাহিক রদবদল সেই নীতিরই প্রতিফলন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিভিন্ন থানায় নতুন নেতৃত্ব আনার মাধ্যমে অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা আরও জোরদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় পর একসঙ্গে দুটি থানায় মহিলা ওসি নিয়োগ শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে নারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও নেতৃত্বের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ থানাগুলিতে তাঁদের নিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বেশি নারী কর্মকর্তাকে নেতৃত্বের ভূমিকায় এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি জনসাধারণের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ, সংবেদনশীল মামলার তদন্ত এবং আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থায় নারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই নিয়োগ সেই ধারাকেই আরও শক্তিশালী করল।
কলকাতা পুলিশের সাম্প্রতিক রদবদল প্রশাসনিক দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৩৩ জন ইন্সপেক্টরের একযোগে বদলি, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ থানায় নতুন ওসি নিয়োগ এবং ১৬ বছর পর একসঙ্গে দুই মহিলা অফিসারের থানার নেতৃত্ব গ্রহণ—সব মিলিয়ে এই পরিবর্তন নতুন প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আগামী দিনে এই নতুন নেতৃত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসেবায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেদিকেই নজর থাকবে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের।

