মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের উত্তেজনা তৈরি হতেই আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। ইরান ও আমেরিকার মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আবহ তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ওপর। ফলে দেশের বাজারে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা এখনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত কয়েকদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির পর আবারও সংঘাত শুরু হয়েছে। আমেরিকার সামরিক হামলায় ইরানের তেহরান, বন্দর আব্বাসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহর কেঁপে উঠেছে। এই হামলার ফলে শুধু রাজনৈতিক উত্তেজনাই নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত—জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ অনেকটাই নির্ভর করে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও তেলের দামে বড় প্রভাব ফেলে। তাই ইরান-আমেরিকার এই নতুন সংঘাত বাজারকে দ্রুত প্রভাবিত করেছে।
কিছুদিন আগেও আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭৭ থেকে ৭৮ ডলারের মধ্যে ছিল। কিন্তু গত দুই দিনের মধ্যে সেই দাম ৮০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ খুব অল্প সময়েই প্রায় ৬ শতাংশ দাম বেড়েছে।
এই হঠাৎ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণ হলো যুদ্ধের আশঙ্কা। যখনই বাজারে এমন সংকট তৈরি হয়, তখন বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতের সরবরাহ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। ফলে তেলের চাহিদা বাড়ার আগেই দাম বাড়তে শুরু করে।
এর আগে যখন ইরান-আমেরিকার মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছিল, তখন তেলের দাম কিছুটা কমে এসেছিল। কিন্তু সেই আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর আবারও দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আগেও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সময় তেলের দাম অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল। একসময় তা ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আবারও সেই পুরনো আতঙ্ক ফিরে এসেছে।
যদি এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। আর সেটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে।
সম্প্রতি ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী জানিয়েছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই বড় অঙ্কের লোকসানে রয়েছে। ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছে এই সংস্থাগুলি।
এই ক্ষতি এখনও পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে যদি আবার তেলের দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সংস্থাগুলির ওপর চাপ আরও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এই চাপ সাধারণ মানুষের ওপরই গিয়ে পড়তে পারে—পেট্রোল, ডিজেল এবং রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে।
তেলের দাম বাড়া মানে শুধু গাড়ির জ্বালানি খরচ বাড়া নয়। এর প্রভাব অনেক গভীর। পরিবহন খরচ বাড়লে বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস—সবকিছুর দাম বাড়তে পারে।
ধরুন, ট্রাক বা লরি চালাতে বেশি খরচ পড়ছে। তাহলে সেই খরচ পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপ ফেলবে। তাই তেলের দাম বাড়া মানে পুরো অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হওয়া।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালী। এটি এমন একটি জলপথ, যার মাধ্যমে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবহন করা হয়। যদি এখানে কোনো বাধা তৈরি হয়, তাহলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই কারণেই ভারতসহ অনেক দেশই চাইছে এই রুট যেন স্বাভাবিক থাকে।
ভারতের বিদেশমন্ত্রক ইতিমধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা ইরান ও আমেরিকা—উভয় পক্ষকেই সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যেন বাধাহীন থাকে, সেই বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ভারতের জন্য উদ্বেগজনক। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুধু অর্থনীতিকেই নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা চায় সব পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুক। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে ইরান ও আমেরিকার পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। যদি সংঘাত আরও বাড়ে, তাহলে তেলের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে। আর যদি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হয়, তাহলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।
তবে এখনকার পরিস্থিতিতে বাজারে অনিশ্চয়তা থাকছেই। আর এই অনিশ্চয়তাই দাম বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়। এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে। ভারতের মতো দেশের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ এখানে তেলের দাম বাড়া মানেই সাধারণ মানুষের জীবনে সরাসরি চাপ তৈরি হওয়া।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো শান্তি এবং স্থিতিশীলতা। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ততই বাড়বে অর্থনৈতিক চাপ—আর তার বোঝা বইতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

