খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিশ্ব সংবাদইরানে ফের মার্কিন বিমান হামলা! ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে কি শুরু হচ্ছে নতুন...

ইরানে ফের মার্কিন বিমান হামলা! ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে কি শুরু হচ্ছে নতুন যুদ্ধ?

বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির অধিকাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ফলে এ এলাকায় সামরিক অভিযান ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যাপক বিমান হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কার্যকর হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। ট্রাম্পের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর পড়তে পারে।

ন্যাটো সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ট্রাম্প জানান, ইরানের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন বাহিনী ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করছে

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানায়, এই হামলার উদ্দেশ্য হলো পারস্য উপসাগরে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করা। সংস্থাটি দাবি করে, আন্তর্জাতিক জলপথে বেসামরিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতি কার্যকর নেই। তাঁর মতে, ইরান বারবার সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে এবং সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র আর আগের অবস্থানে নেই

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, আগের দিনের হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা আঘাত হেনেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতেও যদি একই ধরনের হামলা চালানো হয়, তাহলে আরও কঠোর সামরিক জবাব দেওয়া হবে।

যদিও দিনের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে রূপ নাও নিতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র “কাজ শেষ” করতেও প্রস্তুত।

ট্রাম্প অতীতের মতো এবারও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বিদ্যুৎকেন্দ্র, লবণমুক্তকরণ (ডিস্যালিনেশন) প্ল্যান্ট এবং ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের কথা উল্লেখ করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, খার্গ দ্বীপ ইরানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির অধিকাংশ তেল রপ্তানি এই দ্বীপের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ফলে এ এলাকায় সামরিক অভিযান ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণাঞ্চলের চাবাহার বন্দরে মার্কিন হামলার ফলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়

এছাড়া উপকূলীয় কোনারাক শহরেও একাধিক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে। তবে হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তখনও প্রকাশ করা হয়নি

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়েই সম্পন্ন হয়।

ইরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, এই প্রণালিতে তাদের নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের বিশেষ অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলো এটিকে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচনা করে, যেখানে সব দেশের জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারে

সাম্প্রতিক সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই কৌশলগত জলপথ।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের অন্যতম প্রধান বিষয় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি।

ওয়াশিংটনের দাবি, তেহরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সব ধরনের প্রচেষ্টা বন্ধ করতে হবে এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে দিতে হবে।

অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি তারা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে জব্দ হওয়া সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিরাপত্তা ভূমিকার স্বীকৃতি দাবি করছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, চাপ বা হুমকির কাছে ইরান নতি স্বীকার করবে না।

এদিকে দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আলোচক কাজেম গরিবাবাদি ট্রাম্পের বক্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, সামরিক চাপ দিয়ে কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক অভিযানে ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।

এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার কেন্দ্র, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামো

তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নৌবাহিনী অতীতে ছোট আকারের দ্রুতগতির নৌকা, ড্রোন এবং সমুদ্রে পাতা মাইনের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে শুধু বিমান হামলায় পুরো ঝুঁকি দূর হবে না।

সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম দ্রুত বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারের বেশি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়।

বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন।

ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ারবাজার সূচকগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়।

বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুরু হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবুও উভয় পক্ষের সাম্প্রতিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য নতুন নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতিও বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।

মার্কিন বিমান হামলা, ইরানের পাল্টা অবস্থান এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক আলোচনার পথ এখনও পুরোপুরি বন্ধ না হলেও সামরিক উত্তেজনা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী কয়েকদিনে উভয় পক্ষের পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে পরিস্থিতি নতুন যুদ্ধের দিকে গড়াবে, নাকি আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরে আসবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীরভাবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে, কারণ এই সংঘাতের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।