খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img

এমবাপ্পেকে ক্ষমা চাইতে আলটিমেটাম প্যারাগুয়ের সিনেটরের

ফ্রান্সের তারকা ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্যারাগুয়ের সিনেটর সেলেস্তে আমারিলা এমবাপ্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তার কাছে...
Homeঅর্থ-বানিজ্যচট্টগ্রাম বন্দরে ২৫০ কনটেইনার গায়েব:চোরাচালান নাকি দুর্নীতি?

চট্টগ্রাম বন্দরে ২৫০ কনটেইনার গায়েব:চোরাচালান নাকি দুর্নীতি?

২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শত শত আমদানি চালানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব চালানে ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য, চোরাচালান অথবা শুল্ক ফাঁকির সম্ভাবনা থাকায় এসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ‘লক’ আরোপ করা হয়।

বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমসের নজরদারিতে থাকা অন্তত ২৫০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি এবং মিথ্যা ঘোষণার সন্দেহে চার বছর ধরে বিশেষভাবে ‘লক’ অবস্থায় রাখা এসব কনটেইনারের প্রকৃত অবস্থান এখন নিশ্চিত করতে পারছে না চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। অন্যদিকে, বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টমসের অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে জানিয়েছে, অধিকাংশ কনটেইনারের অবস্থান সম্পর্কে তাদের কাছে স্পষ্ট তথ্য রয়েছে।

এই ঘটনাকে ঘিরে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থার নিরাপত্তা, কাস্টমস ব্যবস্থাপনা এবং বন্দর পরিচালনার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শত শত আমদানি চালানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব চালানে ঘোষণা-বহির্ভূত পণ্য, চোরাচালান অথবা শুল্ক ফাঁকির সম্ভাবনা থাকায় এসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ‘লক’ আরোপ করা হয়।

এই লকের কারণে আমদানিকারকরা বিল অব এন্ট্রি দাখিল করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পণ্য খালাসের সুযোগ পাননি। পরে কিছু চালান বৈধভাবে খালাস করা হয় এবং কিছু নিলামে বিক্রি করা হয়। তবে প্রায় ২৫০টি কনটেইনার দীর্ঘ চার বছরেও কেউ খালাসের উদ্যোগ নেয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা এসব কনটেইনারের কায়িক পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয় কাস্টমস। কিন্তু বাস্তব যাচাইয়ে দেখা যায়, কাগজে থাকা অনেক কনটেইনার বন্দরের ইয়ার্ডে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী—

  • ২০২১ সালের ৮৩টি কনটেইনার
  • ২০২২ সালের ৬১টি
  • ২০২৩ সালের ৪০টি
  • ২০২৪ সালের ৬৬টি

মোট ২৫০টি কনটেইনারের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে কাস্টমস একাধিকবার বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাইলেও অভিযোগ অনুযায়ী সন্তোষজনক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি আলোচনায় আসে ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত একটি নিলামকে কেন্দ্র করে। শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে জব্দ হওয়া দুটি কাপড়ভর্তি কনটেইনার নিলামে বিক্রি করে কাস্টমস।

‘শাহ আমানত ট্রেডিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দিয়ে কনটেইনার দুটি কিনলেও পরে বন্দরের ইয়ার্ডে গিয়ে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি।

এরপরই কাস্টমস লক অবস্থায় থাকা অন্যান্য কনটেইনারের অবস্থান যাচাই শুরু করে এবং নথির সঙ্গে বাস্তব অবস্থার বড় ধরনের অমিল ধরা পড়ে।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে কাস্টমসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআর) শাখা বন্দর কর্তৃপক্ষকে সর্বশেষ তাগিদপত্র পাঠায়।

এর আগেও একই বিষয়ে অন্তত চারবার চিঠি দেওয়া হয়েছিল।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার তারেক মাহমুদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব সুরক্ষার স্বার্থে লক অবস্থায় থাকা সব কনটেইনারের বর্তমান অবস্থান নিশ্চিত করে দ্রুত কাস্টমসকে জানাতে হবে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তারেক মাহমুদ বলেন, লক করা প্রায় ২৫০টি কনটেইনারের অবস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে বারবার যোগাযোগ করেও বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম বন্দরে একটি পূর্ণ কনটেইনার খালাস করতে সাধারণত প্রায় ২৪টি ধাপে অনুমোদন ও স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয়।

এর মধ্যে রয়েছে—

ওয়ান স্টপ সার্ভিস
টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ
ইয়ার্ড কর্মকর্তা
ডেলিভারি স্টাফ
কাস্টমস গেট
অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ

এত কঠোর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকার পরও যদি কোনো কনটেইনার অনুমতি ছাড়া বের হয়ে যায়, তাহলে তা পুরো ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জাল স্বাক্ষর, ভুয়া গেট পাস এবং নকল সিল ব্যবহার করে সংঘবদ্ধভাবে এই ধরনের জালিয়াতি সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।

এ ঘটনায় দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় এখনও প্রচলিত ম্যানুয়াল যাচাইকরণ পদ্ধতির দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কাস্টমসের অভিযোগের পর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দর সচিব মো. নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কাস্টমস যে ২৫০টি চালানের কথা বলছে, প্রকৃত সংখ্যা ২৪৭টি।

এর মধ্যে—

১৬৪টি পূর্ণ কনটেইনার (FCL)
৮৩টি আংশিক কনটেইনার বা এলসিএল কার্গো

এই ১৬৪টি চালানে মোট ২৯৩টি কনটেইনার রয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী—

৮৮টি কনটেইনার কাস্টমসের অনুমোদন নিয়ে বৈধভাবে সরবরাহ করা হয়েছে।
৭০টি কনটেইনার বিভিন্ন বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে (ICD) স্থানান্তর করা হয়েছে।
বর্তমানে ১৩১টি কনটেইনার বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে রয়েছে।
কাস্টমসের তালিকায় অন্তত চারটি কনটেইনার নম্বর ভুলভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এলসিএল কার্গোর ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী—

আটটি চালান বৈধভাবে ডেলিভারি হয়েছে।
৩৫টি চালান এখনও বন্দরের শেড ও সিএফএসে সংরক্ষিত রয়েছে।
বাকি ৪০টি চালানের ক্ষেত্রে কাস্টমস যে বিল অব লেডিং নম্বর দিয়েছে, তা সঠিক নয়। ফলে তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া সংশ্লিষ্ট কনটেইনার ও কার্গো বহু আগেই ‘বাই পেপার’ পদ্ধতিতে কাস্টমসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

তাদের মতে, কনটেইনার গায়েব হওয়ার অভিযোগ বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। তাই এখানে কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি শুধু প্রশাসনিক সমস্যাই নয়, এটি জাতীয় রাজস্ব, বাণিজ্য নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

যদি কাস্টমসের অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এটি হবে দেশের অন্যতম বড় কাস্টমস ও বন্দর নিরাপত্তা সংকটের ঘটনা। আর যদি বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি সঠিক হয়, তাহলে দুই প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের ঘাটতি দ্রুত দূর করা জরুরি।

সূত্র: ট্রিবিউন