বাংলাদেশে বর্ষা এলেই বৃষ্টি যেন স্বাভাবিক এক চিত্র। কিন্তু এবার সেই বৃষ্টি যেন একটু বেশিই দীর্ঘ আর তীব্র হয়ে উঠেছে। গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থেমে থেমে নয়, প্রায় অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এর ফলে শুধু যে রাস্তাঘাটে পানি জমছে তা নয়, অনেক জায়গায় হঠাৎ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, এমনকি পাহাড়ধসের মতো ভয়াবহ ঘটনাও ঘটছে। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা যেন পুরোপুরি ব্যাহত হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু। বর্তমানে এই মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, বিশেষ করে উত্তর বঙ্গোপসাগরে এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। ফলে দেশের প্রায় সব বিভাগেই বৃষ্টিপাত হচ্ছে, কোথাও হালকা, কোথাও আবার ভারী থেকে অতি ভারী।
চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে ভারী বৃষ্টির প্রবণতা বেশি। অন্যদিকে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগেও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক বর্ষার তুলনায় অনেক বেশি তীব্র বলেই মনে করছেন অনেকেই।
টানা ভারী বৃষ্টির সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি হলো পাহাড়ধস। বিশেষ করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙামাটি অঞ্চলে এই ঝুঁকি অনেক বেশি। গত কয়েকদিনে একাধিক পাহাড়ধসের ঘটনায় অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে।
যখন মাটি অতিরিক্ত পানিতে ভিজে যায়, তখন পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে পড়ে এবং সামান্য চাপেই ধসে পড়ে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের জন্য এটি এক বড় হুমকি। তাই এই অঞ্চলের মানুষ এখন আতঙ্কের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন।
বৃষ্টির আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে শহর ও গ্রামে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায়। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো শহরগুলোতে রাস্তাঘাট ডুবে গেছে, অনেক এলাকায় হাঁটাচলা পর্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও বাড়ির ভেতরেও পানি ঢুকে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অফিসগামী মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছেন। প্রতিদিনের জীবন যেন থমকে গেছে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
টানা বৃষ্টি এবং উজানের দেশ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বাংলাদেশের নদ-নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে অন্তত ছয়টি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে। একইভাবে সিলেট অঞ্চলের কুশিয়ারা, মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানিও বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। এসব নদীর তীরবর্তী এলাকায় ইতোমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলায় বন্যার শঙ্কা বেড়েছে। এসব এলাকায় নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে বা কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকে পড়ছে এবং মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হচ্ছে।
এছাড়া তিস্তা নদীর পানিও বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে। নীলফামারী, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা অঞ্চলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় বন্যায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস। বিশেষ করে চেরাপুঞ্জিতে ২০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের স্থান হিসেবে পরিচিত।
এই উজানের পানি খুব দ্রুত বাংলাদেশের নদ-নদীতে নেমে আসে এবং নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত করে। তাই শুধু দেশের ভেতরের বৃষ্টি নয়, বাইরের পরিস্থিতিও আমাদের জন্য বড় প্রভাব ফেলছে।
এটাই এখন সবার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই টানা বৃষ্টি আর কতদিন চলবে? আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অন্তত আরও দুই দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর মধ্যে কিছু জায়গায় অতি ভারী বৃষ্টিও হতে পারে।
তবে আশার কথা হলো, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে। যদিও পুরোপুরি থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনই নেই, তবে তীব্রতা কমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারী বৃষ্টিপাত এবং ঝড়ো আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারি রাখা হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সমুদ্র ও উপকূলীয় অঞ্চলে এখনও আবহাওয়া অস্থির রয়েছে।
মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে নিরাপদে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বসবাসকারীদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সচেতনতা। যারা পাহাড়ি এলাকায় থাকেন, তাদের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা এড়িয়ে চলা উচিত। একইভাবে নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষদেরও সতর্ক থাকতে হবে।
জলাবদ্ধ এলাকায় চলাচলের সময় সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি, কারণ কোথাও কোথাও খোলা ড্রেন বা গর্ত থাকতে পারে। এছাড়া প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বের হওয়াই ভালো।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই টানা বৃষ্টি এখনই থামছে না, তবে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের দিকে যেতে পারে। কিন্তু তার আগে কয়েকদিন সবাইকে একটু কষ্ট সহ্য করতেই হবে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নয়, বরং সতর্ক থেকে এই সময়টা পার করাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
এখন শুধু আশা করা যায়, খুব দ্রুত আকাশ পরিষ্কার হবে, রোদ উঠবে, আর জীবন আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

