খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিওপেন এআইমানবমস্তিষ্কের আদলে তৈরি চিপ! এআই প্রযুক্তিতে শুরু হতে পারে নতুন বিপ্লব

মানবমস্তিষ্কের আদলে তৈরি চিপ! এআই প্রযুক্তিতে শুরু হতে পারে নতুন বিপ্লব

মানবমস্তিষ্কে কোটি কোটি নিউরন একসঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করে এবং অত্যন্ত কম শক্তি ব্যবহার করেই জটিল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নতুন চিপটিও একই ধারণা অনুসরণ করে তথ্য বিশ্লেষণ করে।

মানবমস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল এবং দক্ষ তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা। সেই অসাধারণ কাঠামো থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে এক যুগান্তকারী কম্পিউটার চিপ তৈরি করেছেন চীনের গবেষকেরা। তাঁদের দাবি, নতুন এই ব্রেন-ইনস্পায়ার্ড বা নিউরোমর্ফিক চিপ নির্দিষ্ট ধরনের গণনামূলক কাজে প্রচলিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জিপিইউর তুলনায় অনেক বেশি দক্ষ। এমনকি বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি এনভিডিয়ার A100 GPU-এর তুলনায় সর্বোচ্চ ৪৭৮ গুণ দ্রুত কাজ করতে সক্ষম।

এই উদ্ভাবন শুধু দ্রুতগতির কম্পিউটিংয়ের জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে অ্যালজাইমার্সের মতো স্নায়বিক রোগের গবেষণা, ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

চীনের পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় এবং চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস-এর গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় এই অত্যাধুনিক চিপ তৈরি হয়েছে। গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Science সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে, যা এই আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

গবেষকদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি কম্পিউটিং ব্যবস্থা তৈরি করা, যা মানুষের মস্তিষ্কের মতো দ্রুত এবং দক্ষভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। প্রচলিত কম্পিউটারের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরও কার্যকর গণনাপদ্ধতি তৈরি করাই ছিল তাঁদের মূল উদ্দেশ্য।

বর্তমানের অধিকাংশ শক্তিশালী কম্পিউটার চিপ, যেমন এনভিডিয়ার A100 GPU, দুটি পৃথক অংশে কাজ করে। একটি অংশ তথ্য সংরক্ষণ করে, অন্যটি সেই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে।

এই দুই ইউনিটের মধ্যে বারবার তথ্য আদান-প্রদান করতে হয়। ফলে সময়ের অপচয় হয় এবং শক্তি ব্যবহারের পরিমাণও বেড়ে যায়। প্রযুক্তিবিদদের ভাষায় একে মেমরি বটলনেক বলা হয়।

চীনা গবেষকদের তৈরি নতুন চিপে এই সীমাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে একই মেমরি অ্যারের মধ্যেই তথ্য সংরক্ষণ এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণের কাজ সম্পন্ন হয়। ফলে ডেটা বারবার স্থানান্তরের প্রয়োজন পড়ে না, যার কারণে গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বিদ্যুৎ খরচও কমে।

এই নতুন প্রযুক্তির মূল ভিত্তি মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের কার্যপ্রণালী।

মানবমস্তিষ্কে কোটি কোটি নিউরন একসঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করে এবং অত্যন্ত কম শক্তি ব্যবহার করেই জটিল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নতুন চিপটিও একই ধারণা অনুসরণ করে তথ্য বিশ্লেষণ করে।

প্রচলিত কম্পিউটার যেখানে একের পর এক ধাপে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে, সেখানে এই নিউরোমর্ফিক চিপ অনেক ক্ষেত্রে সমান্তরালভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট ধরনের গণনামূলক কাজে এটি অসাধারণ দক্ষতা দেখাতে সক্ষম হয়।

গবেষকদের দাবি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষায় এই চিপ এনভিডিয়ার A100 GPU-এর তুলনায় সর্বোচ্চ ৪৭৮ গুণ বেশি গতি দেখিয়েছে।

তবে এই দাবির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এই কর্মক্ষমতা সব ধরনের কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটি মূলত মস্তিষ্কের কার্যকলাপের মডেলিং, নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিং এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট গবেষণামূলক কাজের জন্য প্রযোজ্য।

অর্থাৎ সাধারণ গেমিং, ভিডিও এডিটিং, থ্রিডি গ্রাফিক্স রেন্ডারিং কিংবা প্রচলিত এআই ট্রেনিংয়ের প্রতিটি ক্ষেত্রে এটি একইভাবে এনভিডিয়ার GPU-কে ছাড়িয়ে যাবে—এমন দাবি গবেষকেরা করেননি।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় বড় মডেল প্রশিক্ষণ দিতে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং শক্তি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। এর ফলে খরচও বেড়ে যায়।

এই কারণেই বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী GPU তৈরি করছে। কিন্তু শুধু প্রসেসরের ক্ষমতা বাড়ালেই সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হয় না।

গবেষকদের মতে, প্রচলিত কম্পিউটিং স্থাপত্যের সীমাবদ্ধতাই এই ব্যয়ের অন্যতম কারণ।

নতুন ব্রেন-ইনস্পায়ার্ড চিপ সেই সীমাবদ্ধতা কমানোর চেষ্টা করেছে। মানুষের মস্তিষ্ক যেভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করে, সেই পদ্ধতি অনুসরণ করার কারণে এটি নির্দিষ্ট ধরনের এআই গণনায় আরও কার্যকর হতে পারে।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার একটি হলো স্নায়ুবিজ্ঞান।

অ্যালজাইমার্স, পারকিনসন্স কিংবা অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ রোগ নিয়ে গবেষণা করতে বিজ্ঞানীদের মস্তিষ্কের জটিল নিউরাল নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করতে হয়।

নতুন চিপটি বাস্তবসময়ে সেই জটিল নিউরাল কার্যকলাপের মডেল তৈরি করতে সক্ষম হওয়ায় গবেষণা আরও দ্রুত এবং নির্ভুল হতে পারে।

ফলে ভবিষ্যতে নতুন ওষুধ আবিষ্কার, রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির উন্নয়নে এই উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমানে ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা BCI প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক এবং কম্পিউটারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব।

এ ধরনের প্রযুক্তি পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে, কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ভবিষ্যতের স্মার্ট চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে।

গবেষকদের বিশ্বাস, তাঁদের তৈরি নতুন চিপ ভবিষ্যতের BCI প্রযুক্তিকে আরও দ্রুত, নির্ভুল এবং শক্তি-সাশ্রয়ী করে তুলতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন AI হার্ডওয়্যারের বাজারে এনভিডিয়া শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। তবে বিভিন্ন দেশ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এখন বিকল্প কম্পিউটিং প্রযুক্তির দিকে জোর দিচ্ছে।

চীনের এই নিউরোমর্ফিক চিপ সেই প্রচেষ্টারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতের কম্পিউটিং শুধু আরও বড় GPU তৈরির ওপর নির্ভর করবে না; বরং মানুষের মস্তিষ্কের মতো দক্ষ স্থাপত্য অনুসরণ করেও বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিং এখনও বিকাশমান একটি ক্ষেত্র। এই প্রযুক্তি এখনই প্রচলিত কম্পিউটার বা GPU-এর বিকল্প হয়ে উঠছে না। তবে বিশেষ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রোবোটিক্স এবং উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এটি আগামী দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হয়ে উঠতে পারে।

যদি ভবিষ্যতে এই ধরনের চিপ আরও পরিণত হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়, তাহলে কম শক্তি ব্যবহার করে অনেক বেশি দক্ষ কম্পিউটিং সম্ভব হবে। ফলে এআই, স্বাস্থ্যসেবা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জগতে এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।