বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব যত এগিয়ে যায়, প্রতিটি ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনা ততই বাড়তে থাকে। তবে মাঠের ফুটবলের পাশাপাশি অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রেফারিরাও। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ফ্রান্স ও মরক্কোর কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের আগে ফিফার রেফারি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। বিশেষ করে ম্যাচ পরিচালনার পাঁচজন ম্যাচ অফিসিয়ালই আর্জেন্টিনার হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বিশ্বকাপের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার কথা ফ্রান্স ও মরক্কোর। ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে রেফারিং প্যানেল।
ফিফা এই ম্যাচ পরিচালনার জন্য যে পাঁচজন ম্যাচ অফিসিয়ালকে দায়িত্ব দিয়েছে, তারা সবাই আর্জেন্টিনার। বিশ্বকাপের এবারের আসরে এটি প্রথম ঘটনা, যেখানে প্রধান রেফারি, দুই সহকারী রেফারি, চতুর্থ কর্মকর্তা এবং রিজার্ভ কর্মকর্তা—সকলেই একই দেশের প্রতিনিধি।
এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর থেকেই ফুটবলপ্রেমীদের একাংশ নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন।
বিশ্বকাপে সাধারণত প্রধান রেফারি ও সহকারী রেফারিরা একই দেশের হলেও চতুর্থ কর্মকর্তা, রিজার্ভ কর্মকর্তা কিংবা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) ভিন্ন দেশের হয়ে থাকেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা।
কিন্তু এবার সেই প্রচলিত চিত্র থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম দেখা গেছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, এমন সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দেওয়াই স্বাভাবিক।
বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। তাই ম্যাচ অফিসিয়ালদের জাতীয়তা নিয়েও আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ ইতিহাস বেশ নাটকীয়।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে ফ্রান্স আর্জেন্টিনাকে বিদায় করেছিল। পরে তারা শিরোপাও জেতে। অন্যদিকে পরবর্তী বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা নাটকীয় লড়াই শেষে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
এই দুই দলের সাম্প্রতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে অনেক সমর্থকের ধারণা, আর্জেন্টিনার ম্যাচ অফিসিয়ালদের নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি হতে পারে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
ফিফার ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী ম্যাচের প্রধান রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ফাকুন্দো তেলো।
তার সঙ্গে সহকারী রেফারি হিসেবে থাকবেন জুয়ান পাবলো বেলাত্তি এবং গ্যাব্রিয়েল চাদ। এছাড়া চতুর্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন দারিও হেরেরা এবং রিজার্ভ কর্মকর্তা হিসেবে থাকবেন ক্রিস্টিয়ান নাভারো।
এই পুরো প্যানেলই আর্জেন্টিনার হওয়ায় বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
ফাকুন্দো তেলো দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম অভিজ্ঞ রেফারি হিসেবে পরিচিত। কঠোরভাবে ম্যাচ পরিচালনার জন্য তার আলাদা সুনাম রয়েছে।
২০২২ সালের বিশ্বকাপে পর্তুগাল ও মরক্কোর ম্যাচে তিনি মরক্কোর ফরোয়ার্ড ওয়ালিদ চেদিরাকে লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে তৎকালীন সময়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল।
একই বছরে আর্জেন্টিনার ঘরোয়া ফুটবলে বোকা জুনিয়র্স ও রেসিং ক্লাবের উত্তপ্ত ম্যাচে তিনি একসঙ্গে ১০টি লাল কার্ড দেখিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিলেন।
ফ্রান্সের কোনো ম্যাচে এটি তার প্রথম দায়িত্ব হতে যাচ্ছে।
রেফারি নিয়োগের খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
কিছু ফরাসি সমর্থক ফিফার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেন। কেউ কেউ লিখেছেন, যদি এতটাই আর্জেন্টিনার প্রতিনিধিত্ব থাকে, তাহলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির দায়িত্বও যেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলারকেই দিয়ে দেওয়া হয়।
এসব মন্তব্য মূলত ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ হলেও তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে।
ঘটনাচক্রে, আর্জেন্টিনার একটি ম্যাচ পরিচালনা করেছিলেন ফরাসি নাগরিক ফ্রাঁসোয়া লেতেসিয়ে। সেই ম্যাচের পরও কিছু সমর্থক অভিযোগ করেছিলেন যে তিনি আর্জেন্টিনার পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
যদিও সেই অভিযোগ কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং ফিফাও এ বিষয়ে কোনো অনিয়মের কথা জানায়নি।
এই ঘটনার কারণে অনেকেই মনে করছেন, রেফারিদের জাতীয়তা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বড় টুর্নামেন্টে এমন আলোচনা প্রায়ই দেখা যায়।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা রেফারি নির্বাচন করে বিভিন্ন মানদণ্ড বিবেচনা করে। অভিজ্ঞতা, পারফরম্যান্স, ফিটনেস, আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনার রেকর্ড এবং টেকনিক্যাল মূল্যায়নের ভিত্তিতেই সাধারণত ম্যাচ অফিসিয়াল নির্বাচন করা হয়।
তবে কোনো সিদ্ধান্ত যদি সমর্থকদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের জন্ম দেয়। যদিও শুধুমাত্র জাতীয়তার ভিত্তিতে কোনো রেফারির নিরপেক্ষতা নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
শেষ পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্সই প্রমাণ করবে ম্যাচ পরিচালনা কতটা নিরপেক্ষ ছিল।
ফ্রান্স ও মরক্কোর গুরুত্বপূর্ণ কোয়ার্টার ফাইনালের আগে রেফারি নিয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা বিশ্বকাপের উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাঁচজন ম্যাচ অফিসিয়ালই আর্জেন্টিনার হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ও কটাক্ষ দেখা গেলেও এখন পর্যন্ত পক্ষপাতিত্বের কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি।
বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ আসরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত। তাই সব বিতর্কের অবসান ঘটাতে শেষ পর্যন্ত নজর থাকবে ম্যাচ পরিচালনা কতটা নির্ভুল ও পেশাদারভাবে সম্পন্ন হয়, সেদিকেই।

