বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই উত্তেজনা, মানেই টিকিটের জন্য হাহাকার—এটাই ছিল এতদিনের চেনা দৃশ্য। কিন্তু এবারের চিত্র যেন পুরো উল্টো। যেখানে একসময় একটি ম্যাচের টিকিটের দাম ৪ হাজার ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, এখন সেই দাম দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—এমন কেন হচ্ছে? আর এই মন্দা বাজারে নতুন করে প্রাণ ফেরাতে কি সত্যিই একমাত্র ভরসা লিওনেল মেসি?
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর নকআউট পর্বে টিকিটের দাম কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বড় তারকাদের বিদায়। ফুটবলে তারকারা শুধু মাঠেই নয়, গ্যালারিতেও প্রভাব ফেলেন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, নেইমার কিংবা ভিনিসিয়াস জুনিয়রের মতো তারকারা যখন টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যান, তখন স্বাভাবিকভাবেই দর্শকদের আগ্রহ কমে যায়।
টিকিট বিশ্লেষণকারী সংস্থা ‘টিকপিক’-এর তথ্য বলছে, স্পেন বনাম বেলজিয়াম ম্যাচের টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য ২৯৫০ ডলার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২০০ ডলারে। এই পতন শুধু সংখ্যার হিসেবে নয়, আগ্রহের প্রতিফলনও বটে।
পর্তুগালের বিদায় টিকিট বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি এক ধরনের ব্র্যান্ড। তার ম্যাচ মানেই আলাদা আকর্ষণ। স্পেনের কাছে হেরে পর্তুগাল বিদায় নেওয়ায় সম্ভাব্য আমেরিকা-পর্তুগাল কোয়ার্টার ফাইনাল আর হয়নি। এই ম্যাচটি হলে টিকিটের চাহিদা আকাশছোঁয়া হতে পারত—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ব্রাজিল সবসময়ই বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণ। নেইমার ও ভিনিসিয়াসদের দল বিদায় নেওয়ায় সেই আকর্ষণে বড় ধাক্কা লাগে। নরওয়ের কাছে হেরে ব্রাজিলের বিদায় যেন টিকিট বাজারে আরেকটি পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্রাজিলের ম্যাচ মানেই রঙিন গ্যালারি, উচ্ছ্বাস আর উন্মাদনা—যা এখন অনেকটাই ফিকে।
কিছু ম্যাচে দর্শকদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় টিকিটের দামও কমেছে। উদাহরণ হিসেবে ফ্রান্স বনাম মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনালের কথা বলা যায়। এই ম্যাচের টিকিটের সর্বনিম্ন মূল্য নেমে এসেছে ৯৮৯ ডলারে, যা অন্য কোয়ার্টার ফাইনালগুলোর তুলনায় অনেক কম।
দর্শকদের আগ্রহ অনেক সময় নির্ভর করে ম্যাচের ‘গ্ল্যামার’-এর ওপর। বড় দল, বড় তারকা বা ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকলে সেই আগ্রহ কমে যায়—এটাই বাস্তবতা।
আয়োজক দেশ হিসেবে আমেরিকার উপস্থিতি টিকিটের দামে বড় ভূমিকা রাখতে পারত। অনেকেই মনে করেছিলেন, আমেরিকা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলে টিকিটের দাম তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারত। কিন্তু বেলজিয়ামের কাছে হেরে তারা বিদায় নেওয়ায় সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
স্থানীয় সমর্থকদের উপস্থিতি সবসময়ই ম্যাচের পরিবেশকে প্রভাবিত করে। আয়োজক দেশের দল থাকলে গ্যালারি পূর্ণ থাকে, আর সেটাই টিকিটের চাহিদা বাড়ায়।
আমেরিকা-বেলজিয়াম ম্যাচের টিকিটের দামের ওঠানামা ছিল চোখে পড়ার মতো। একসময় গেট-ইন টিকিটের দাম প্রায় ৪ হাজার ডলারে পৌঁছেছিল। পরে তা কমে ১৫৪৯ ডলারে নামে। আবার আমেরিকা প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর দাম বেড়ে ২৮৩৬ ডলার হয়। এরপর আবার কয়েক দিনের মধ্যে তা কমতে শুরু করে।
শনিবার দুপুরে টিকিটের দাম নেমে আসে ১৪২৩ ডলারে, যা আগের কয়েক দিনের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ কম। তবে সন্ধ্যার দিকে কিছুটা বাড়লেও তা আগের উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেনি।
নকআউট পর্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ম্যাচ ছিল মেক্সিকো বনাম ইংল্যান্ড। এই ম্যাচের সর্বনিম্ন টিকিট মূল্য ছিল ৩৫৭৪ ডলার। এটি প্রমাণ করে, নির্দিষ্ট কিছু ম্যাচ এখনও দর্শকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করছেন, লিওনেল মেসিই হতে পারেন টিকিট বাজারের ‘মসিহা’। আর্জেন্টিনার ম্যাচ যত এগোবে, ততই দর্শকদের আগ্রহ বাড়বে—এমনটাই আশা করা হচ্ছে।
মেসির খেলা মানেই এক ধরনের আবেগ। অনেক দর্শক শুধুমাত্র তাকে মাঠে দেখতে টিকিট কেনেন। তাই তার উপস্থিতি টিকিট বিক্রিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ফুটবল এখন শুধু খেলা নয়, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক শিল্প। এখানে তারকারা শুধু খেলেন না, তারা বাজারও তৈরি করেন। একজন বড় তারকার উপস্থিতি মানেই বেশি স্পন্সর, বেশি দর্শক, বেশি টিকিট বিক্রি।
এই বিশ্বকাপে সেটাই স্পষ্ট হয়েছে। রোনাল্ডো, নেইমার বা ব্রাজিল-পর্তুগালের মতো দল না থাকলে বাজারে প্রভাব পড়বেই—এটাই স্বাভাবিক।
বিশ্বকাপ যত এগোবে, টিকিটের বাজারেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যদি আর্জেন্টিনা ফাইনালের দিকে এগোয়, তাহলে আবারও টিকিটের দাম বাড়তে পারে।
ফুটবলপ্রেমীরা এখন অপেক্ষায়—মেসির জাদু কি আবারও গ্যালারিতে আগুন জ্বালাতে পারবে?
বিশ্বকাপের টিকিট বাজারে এই অস্বাভাবিক ওঠানামা আমাদের নতুন একটি বাস্তবতা দেখাচ্ছে। এখানে শুধু দল নয়, তারকারাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাদের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি পুরো বাজারকে বদলে দিতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত কে জেতে—শুধু মাঠের খেলায় নয়, দর্শকদের হৃদয়েও। আর সেই লড়াইয়ে মেসি কি সত্যিই ‘মসিহা’ হয়ে উঠবেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

