খবর পান সবার আগে

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। আমাদের নিউজলেটারে সাবস্ক্রাইব করুন এবং দেশ-বিদেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো প্রতিদিন আপনার ইমেইলে পান।

― Advertisement ―

spot_imgspot_img
Homeটকিং পয়েন্টকেন বাঙালি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় বিভক্ত? বিশ্বকাপের পেছনের সাংস্কৃতিক রহস্য

কেন বাঙালি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনায় বিভক্ত? বিশ্বকাপের পেছনের সাংস্কৃতিক রহস্য

চে গুয়েভারার বিপ্লব, পাবলো নেরুদার কবিতা, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের জাদুবাস্তবতা—এসব বাঙালির মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। লাতিন আমেরিকার সংগ্রাম, প্রেম আর কল্পনার গল্পগুলো বাঙালির নিজের গল্পের মতো মনে হয়েছে।

বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই বাংলার পরিবেশ বদলে যায়। হঠাৎ করে পাড়া-মহল্লা, ছাদ, রাস্তা—সব জায়গায় উড়তে থাকে হলুদ-সবুজ আর আকাশি-সাদা পতাকা। যেন হাজার মাইল দূরের ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা বাংলারই দুই প্রতিবেশী দেশ। প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক—কেন এমন হয়? কেন বাঙালির হৃদয়ে এত গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে এই দুই দেশ?

আসলে বিষয়টা শুধু ফুটবল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, আবেগ, স্মৃতি আর সংস্কৃতি।

বাংলায় বিশ্বকাপ মানে শুধু খেলা দেখা নয়, এটা এক ধরনের উৎসব। যেমন ধরো ঈদ বা পূজা—তেমনই একটা আনন্দের সময়। আগে একটা পাড়ায় হয়তো একটাই টিভি থাকত। সেই বাড়ির সামনে মাদুর পেতে সবাই একসঙ্গে খেলা দেখত। গোল হলেই সবাই চিৎকার করত, যেন নিজের দেশ জিতেছে।

এই একসঙ্গে খেলা দেখার অভ্যাসটা বাঙালির মনে ফুটবলকে শুধু খেলা হিসেবে রাখেনি, এটাকে বানিয়েছে একটা সামাজিক অভিজ্ঞতা।

বাংলায় আন্তর্জাতিক ফুটবলের জনপ্রিয়তা বাড়ার বড় কারণ ছিল টেলিভিশন। ১৯৮২ সালের এশিয়ান গেমসের সময় ভারতে রঙিন টিভি আসে। তখন থেকেই মানুষ প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের খেলা চোখের সামনে দেখতে শুরু করে।

তার আগে মানুষ শুধু পত্রিকা বা রেডিওতে শুনত। কিন্তু চোখে দেখার অভিজ্ঞতা একেবারে আলাদা। সেই অনুভূতি মানুষকে খেলাটার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করে দেয়।

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ছিল এক টার্নিং পয়েন্ট। এই বিশ্বকাপেই দিয়েগো মারাদোনা নিজের জাদু দেখিয়ে পুরো পৃথিবীকে মুগ্ধ করেন। তার ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল নিয়ে যত বিতর্ক, তার থেকেও বেশি আলোড়ন তোলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার অসাধারণ ড্রিবলিং করে করা গোল।

পাঁচজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করা সেই গোল শুধু একটা গোল ছিল না—এটা ছিল এক শিল্পকর্ম।

বাংলার মানুষের কাছে এই গোলের একটা আলাদা মানে ছিল। কারণ এর পেছনে ছিল ইতিহাস—ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি। অনেকেই এটাকে প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখেছিলেন।

ব্রাজিল মানেই পেলে। তার ফুটবল ছিল নাচের মতো, আনন্দের মতো। মাঠে বল পেলে মনে হতো তিনি শিল্প তৈরি করছেন।

অন্যদিকে মারাদোনা ছিলেন সংগ্রামের প্রতীক। বস্তি থেকে উঠে এসে বিশ্বসেরা হওয়ার গল্পটা মানুষের মনে আলাদা করে দাগ কাটে।

একদিকে পেলের হাসি—যেখানে ফুটবল মানে আনন্দ। অন্যদিকে মারাদোনার অশ্রু—যেখানে ফুটবল মানে লড়াই।

এই দুই বিপরীত আবেগই বাঙালির মনে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে।

বিষয়টা শুধু ফুটবলেই থেমে নেই। লাতিন আমেরিকার সঙ্গে বাঙালির একটা পুরনো সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আছে।

চে গুয়েভারার বিপ্লব, পাবলো নেরুদার কবিতা, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের জাদুবাস্তবতা—এসব বাঙালির মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। লাতিন আমেরিকার সংগ্রাম, প্রেম আর কল্পনার গল্পগুলো বাঙালির নিজের গল্পের মতো মনে হয়েছে।

তাই ফুটবল যখন এই অঞ্চল থেকে আসে, তখন সেটাও বাঙালির কাছে খুব আপন মনে হয়।

বাঙালি শুধু জয় দেখতে চায় না, জয়ের সৌন্দর্যও দেখতে চায়। ব্রাজিলের সাম্বা স্টাইল ফুটবল কিংবা আর্জেন্টিনার ড্রিবলিং—এই সবকিছুতেই একটা শিল্পের ছোঁয়া আছে।

জার্মানির মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ খেলা বা ইতালির রক্ষণাত্মক কৌশলকে মানুষ সম্মান করে, কিন্তু হৃদয় টানে সেই খেলাকে যেখানে সৌন্দর্য আছে, সৃজনশীলতা আছে।

বাংলায় অনেক পরিবারে মজার একটা দৃশ্য দেখা যায়। বাবা ব্রাজিলের সমর্থক, ছেলে আর্জেন্টিনার। দাদা ব্রাজিল, নাতি আর্জেন্টিনা।

এটা কাকতালীয় নয়। এটা আসলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।

একজন বাবা তার ছেলেকে প্রথম যে জার্সিটা কিনে দেয়, সেটাই হয়ে যায় তার প্রিয় দল। একজন দাদু যে গল্পটা নাতিকে শোনায়, সেটাই তার আবেগ হয়ে যায়।

এইভাবেই ফুটবল ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।

নব্বইয়ের দশকে কেবল টিভি আসার পর বিশ্বকাপ আরও সহজলভ্য হয়ে যায়। তখন শুধু খেলা দেখা নয়, পতাকা লাগানো, দেয়ালে ছবি আঁকা, বাজি ধরা—সব মিলিয়ে পুরো মাসজুড়ে একটা উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়।

ফুটবল তখন আর শুধু খেলা থাকে না, এটা হয়ে যায় জীবনযাপনের একটা অংশ।

এখনকার সময়ে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল খুব জনপ্রিয়। নতুন প্রজন্ম মেসি, রোনালদো, নেইমার—এদের নিয়েই বেশি ব্যস্ত।

তবুও বিশ্বকাপ এলেই পুরনো আবেগগুলো আবার জেগে ওঠে। মানুষ আবার ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা হাতে নেয়।

কারণ এটা শুধু বর্তমানের সমর্থন নয়—এটা স্মৃতির প্রতি ভালোবাসা।

ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা বাঙালির কাছে শুধু দুইটা ফুটবল দল নয়। এগুলো দুইটা অনুভূতি, দুইটা গল্প।

একটাতে আছে পেলের হাসি—যেখানে আনন্দ আর সৌন্দর্য। অন্যটাতে আছে মারাদোনার অশ্রু—যেখানে সংগ্রাম আর আবেগ।

বিশ্বকাপের সময় যখন বাংলার আকাশে এই দুই দেশের পতাকা উড়ে, তখন সেটা শুধু খেলার সমর্থন নয়। এটা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে যাওয়া স্মৃতির প্রকাশ।

এটাই বাঙালির ফুটবল ভালোবাসার আসল গল্প—যেখানে খেলা ছাড়িয়ে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি আর গভীর আবেগ।

সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন।