২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলা ও তদন্তের আলোকে বড় ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। অভিযোগের মুখে থাকা অন্তত ৮০ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে অব্যাহতির প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এরই মধ্যে তিনজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। বাকি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তথ্য সূত্র: সারাবাংলা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতেও ব্যাপক পরিবর্তন আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে পুলিশের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সদস্যও কর্মস্থল ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। তাদের মধ্যে অনেকে বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলেও গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য রয়েছে।
সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকায় এসব কর্মকর্তাকে প্রথমে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করা হয়। পরে একাধিকবার নোটিশ, গণবিজ্ঞপ্তি এবং কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলেও অধিকাংশ কর্মকর্তা সাড়া দেননি। ফলে প্রশাসনিক বিধি অনুসরণ করে তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চাকরিচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর অতিরিক্ত ও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া কিংবা সরাসরি অংশ নেওয়া।
জাতিসংঘের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ের সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
সরকারের অবস্থান হলো, যেসব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড, মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও বিচারিক উভয় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ডিআইজি থেকে শুরু করে এএসপি পদমর্যাদার অন্তত ৮০ জন কর্মকর্তার একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই তালিকার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালত ও তদন্ত সংস্থায় মামলা চলমান রয়েছে।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে ৩৩তম বিসিএসের মিশু বিশ্বাস ও জুয়েল চাকমা এবং ৩৬তম বিসিএসের মাহমুদুল হাসানকে সরকারি চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো এবং অতীতের কিছু গুম ও হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, যা তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, পল্টন, উত্তরা ও মোহাম্মদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
তদন্তে এমন অভিযোগও এসেছে যে, কোথাও কোথাও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সরাসরি অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করতে দেখা গেছে। এসব অভিযোগ বর্তমানে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।
চাকরিচ্যুতির তালিকায় ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ, যুগ্ম কমিশনার মেহেদি হাসান এবং সঞ্জীব কুমারের নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিপ্লব কুমার সরকারকে জুলাই-পরবর্তী সময়ে সাময়িক বরখাস্ত করে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি। পরে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গেছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তথ্য রয়েছে। বর্তমানে তিনি কোথায় অবস্থান করছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধেও আন্দোলনের সময় সমন্বয়কদের আটক ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে চাপ প্রয়োগের চেষ্টাও করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বিদেশে অবস্থান করেই তিনি একাধিক অডিও বার্তায় নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন।
চাকরিচ্যুতির তালিকায় অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ার্দারের নামও রয়েছে। তদন্ত সূত্রের দাবি, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং ছাত্র আন্দোলন দমনে তার ভূমিকা নিয়ে একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিনিও বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তালিকায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি আনিসুর রহমান এবং সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি জায়েদুল আলমের নামও রয়েছে।
এ ছাড়া আরও যেসব কর্মকর্তার নাম বিভিন্ন সূত্রে এসেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন—
বিপ্লব বিজয় তালুকদার, টুটুল চক্রবর্তী, নূরে আলম মিনা, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, মানস কুমার পোদ্দার, গোলাম মোস্তফা রাসেল, কাজী আশরাফুল আজীম এবং রিফাত রহমান শামীম।
সরকারি নথিতে এদের অধিকাংশকেই দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ও পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচারিক কার্যক্রম চলবে।
যেসব মামলার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় পড়ে, সেগুলো সেখানে বিচারাধীন থাকবে। অন্যদিকে, ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আদালতেই বিচার হবে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা) কাজী মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্তত ৮০ জন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান রয়েছে।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে তিনজন কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে চূড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। বাকি কর্মকর্তাদের তালিকা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। খুব শিগগিরই তাদের বিরুদ্ধেও চাকরিচ্যুতির প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

