বাংলাদেশজুড়ে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টায় আরও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়াবিদদের মতে, দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সাময়িক জলাবদ্ধতা এবং উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকা ও নগরাঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, টানা ভারী বর্ষণের কারণে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। নগরীর অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নিম্নাঞ্চলে পানি জমে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে নগর অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে তাকে ভারী বর্ষণ বলা হয়। আর একই সময়ে ৮৮ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হলে সেটিকে অতিভারী বর্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ ধরনের বৃষ্টিপাত দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বন্যার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ুর অক্ষ ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল অতিক্রম করে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।
এছাড়া এই মৌসুমি বায়ুর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমানে বাংলাদেশের ওপর মৌসুমি বায়ু সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরেও এটি মাঝারি শক্তিতে বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতির কারণেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের তিনটি নদীর চারটি পর্যবেক্ষণ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আগামী দুই দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এর ফলে সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উত্তরাঞ্চলের তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানিও কয়েকটি স্থানে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনকে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখতে বলা হয়েছে।
যেখানে উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেখানে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ধীরে ধীরে কমতে পারে। ফলে এসব এলাকায় চলমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত কয়েকদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই বর্ষণে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা, সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে।
শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস দেখা দেয়। পরে এই দুর্যোগ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে। এখন রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বহু জেলায় টানা বর্ষণের কারণে জনদুর্ভোগ বাড়ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং ভূমিধসের কারণে দেশের সাতটি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বান্দরবান, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রাম জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫১ জনে পৌঁছেছে। এছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ৩৯ জন। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে এবং হাজারো মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সরকারি ও স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা দুর্গত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ এবং উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস সংস্থাগুলো জানিয়েছে, আগামী কয়েকদিন পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। যেসব এলাকায় নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে, সেসব এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের অবস্থান সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে রাখা এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সারা দেশে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে বৃষ্টিপাত আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বন্যা এবং রাজধানীতে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়লেও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। নাগরিকদেরও সর্বশেষ আবহাওয়া বুলেটিন ও সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

