বর্ষাকাল ক্যালেন্ডারের হিসাবে পেরিয়ে শরৎ এলেও পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টির দাপট এখনই কমছে না। বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশে নতুন করে একটি নিম্নচাপ অঞ্চল তৈরি হওয়ায় রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে একটি ঘূর্ণাবর্ত। পাশাপাশি সক্রিয় রয়েছে বর্ষাকালীন অক্ষরেখাও। এই তিনটি আবহাওয়াগত পরিস্থিতির প্রভাবে দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু জেলাতেও বৃষ্টি হতে পারে।
আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় সোমবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত বৃষ্টির প্রবণতা থাকবে। কিছু এলাকায় বুধবার পর্যন্তও বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি হতে পারে। উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় আবার ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরের উপর যে নিম্নচাপ অঞ্চলটি তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে একটি ঘূর্ণাবর্তও অবস্থান করছে। আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭.৬ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত এই ঘূর্ণাবর্তের প্রভাব রয়েছে।
অন্যদিকে, বর্ষাকালীন অক্ষরেখাও এখনও সক্রিয়। পঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশ হয়ে এই অক্ষরেখা পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। এরপর তা নিম্নচাপ অঞ্চলের উপর দিয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। আরও একটি অক্ষরেখা নিম্নচাপ সংলগ্ন ঘূর্ণাবর্তের উপর দিয়ে উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড ও ছত্তীসগঢ়ের দিকে অবস্থান করছে।
এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে আগামী কয়েক দিন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টিও হতে পারে।
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দক্ষিণবঙ্গের সব জেলায় একই সময় পর্যন্ত বৃষ্টি হবে না। একেক এলাকায় একেক রকম পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
কলকাতা, হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান ও হুগলি জেলায় সোমবার পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি চলতে পারে। এরপর এই জেলাগুলির জন্য আপাতত বড় কোনও সতর্কতা নেই।
অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরে মঙ্গলবার পর্যন্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এই জেলাগুলির কিছু জায়গায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিও হতে পারে।
ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়ায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নিচু এলাকা এবং জল জমার প্রবণতা রয়েছে এমন জায়গায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে।
দক্ষিণবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতেও বুধবার পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এরপর ধীরে ধীরে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে পারে বলে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস।
কলকাতাতেও আপাতত বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সোমবার পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হতে পারে। তবে কলকাতার জন্য দীর্ঘস্থায়ী ভারী বৃষ্টির কোনও বিশেষ সতর্কতা আপাতত নেই।
বৃষ্টির পাশাপাশি আর্দ্রতাজনিত অস্বস্তিও থাকতে পারে। কারণ তাপমাত্রা এখনও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি রয়েছে।
সোমবার সকালে কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৪ ডিগ্রি বেশি। রবিবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেটিও স্বাভাবিকের তুলনায় ১.৪ ডিগ্রি বেশি।
অর্থাৎ, বৃষ্টি হলেও কলকাতায় গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার অনুভূতি পুরোপুরি কাটবে না।
শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয়, উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে পাহাড় ও ডুয়ার্স সংলগ্ন জেলাগুলিতে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।
দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং ও আলিপুরদুয়ারে মঙ্গলবার ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর পর সাময়িকভাবে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমলেও শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত ফের এই জেলাগুলিতে বৃষ্টি বাড়তে পারে।
তবে উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহে আপাতত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে এই জেলাগুলি পুরোপুরি শুকনো থাকবে। বুধবার পর্যন্ত এই তিন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হতে পারে।
নিম্নচাপের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরের উত্তর অংশে বাতাসের গতিবেগ বেড়েছে। সেখানে ঘণ্টায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে। এর ফলে সমুদ্র উত্তাল থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশা উপকূলের মৎস্যজীবীদের জন্য সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত তাঁদের সমুদ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সমুদ্রে ইতিমধ্যে থাকা মাছ ধরার নৌকাগুলিকেও দ্রুত নিরাপদ স্থানে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। কারণ নিম্নচাপের প্রভাবে হঠাৎ করে বাতাসের গতি এবং ঢেউয়ের উচ্চতা বেড়ে যেতে পারে।
ক্যালেন্ডারে বর্ষাকাল শেষ হয়ে শরৎ শুরু হয়েছে। কিন্তু আবহাওয়ার হিসাবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এখনও পুরোপুরি বর্ষা বিদায় নেয়নি। তাই বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ বা ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হলে তার প্রভাব রাজ্যের আবহাওয়ায় পড়তে পারে।
সহজভাবে বললে, বর্ষা শেষ হওয়ার সময় এলেও বাতাসে এখনও পর্যাপ্ত জলীয়বাষ্প রয়েছে। তার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের মতো আবহাওয়াগত পরিস্থিতি তৈরি হলে বৃষ্টির পরিবেশ তৈরি হয়।
এবারও অনেকটা তেমনই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে শরৎকাল শুরু হলেও দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টির পর্ব অব্যাহত রয়েছে।
দক্ষিণবঙ্গের ক্ষেত্রে বুধবার পর্যন্ত কিছু জেলায় বিক্ষিপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও এরপর ধীরে ধীরে বৃষ্টির পরিমাণ কমতে পারে। তবে উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও ডুয়ার্সের কয়েকটি জেলায় আবার সপ্তাহের শেষ দিকে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।
অর্থাৎ, রাজ্যজুড়ে একসঙ্গে বৃষ্টি পুরোপুরি থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। কোথাও বৃষ্টি কমবে, আবার কোথাও নতুন করে বৃষ্টির প্রবণতা বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ এবং সক্রিয় অক্ষরেখার প্রভাবে আগামী কয়েক দিন পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় পরিবর্তন থাকছে। কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় ছাতা সঙ্গে রাখাই ভালো। আর উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও মৎস্যজীবীদের সমুদ্রের পরিস্থিতি নিয়ে আবহাওয়া দফতরের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

