প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চলছে গত ৫ আগস্টের আগে থেকেই। কূটনৈতিক চ্যানেলে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, এজেন্ডা নির্ধারণে চলছিল যোগাযোগ। এমনকি তারিখও প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লিতে গত ৫ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে তারেক রহমানের ভারত সফর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। সেই অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। কূটনৈতিক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, এ নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি’র সঙ্গে তেমন কোনও নৈকট্য ছিল না। দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ৬ মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি হতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম ভারত সফর। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি ছিল, চলতি আগস্ট মাসের শেষেই দিল্লি যাবেন প্রধানমন্ত্রী। তবে সফর নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা আছে। তারেক রহমানের এই সফরের পেছনে দুটি আমন্ত্রণ কাজ করছে। একটি দ্বিপাক্ষিক, অন্যটি ব্রিকস সম্মেলন।
তবে আগামী সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিধিদল যাবে এটি মোটামুটি নিশ্চিত। কিন্তু দ্বিপাক্ষিক সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি যাওয়া এখনও অনিশ্চিত। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আগামী সপ্তাহে একটা চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে। যদিও সেটা নির্ভর করবে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের ওপরে।
বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারত যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এই আমন্ত্রণ আসে বলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল নিশ্চিত করেন। এর পাশাপাশি চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। আগামী ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন হবে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশকে আউটরিচ অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
গত ১৪ জুলাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয় এবং ২৩ জুলাই তা প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে তার কাছে কোনও আপডেট নেই। তিনি এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগের অনুরোধ করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-বাংলাদেশের আস্থা পুনর্গঠনের পরীক্ষা হবে এই সফর। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে ভারতের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখা দল হিসেবে পরিচিত। তাই তারেক রহমানের এই সফর ভারতের কাছে একটি বার্তা যে ঢাকা সম্পর্ককে আদর্শ নয়, বাস্তবতার নিরিখে দেখতে চায়।
এছাড়া দিল্লির জন্য বাংলাদেশকে হারানো কৌশলগতভাবে ব্যয়বহুল। চীনের প্রভাব মোকাবিলা, উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা ও ট্রানজিট- সবকিছুতেই ঢাকা অপরিহার্য। তাই মোদি সরকার শুরু থেকেই তারেক রহমান সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দিল্লি সফর এবং ১০ আগস্ট ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ সেই আগ্রহেরই অংশ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের এজেন্ডা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই সফর দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে এজেন্ডা নির্ধারণের চেষ্টা চলছিল। এজেন্ডার মধ্যে আছে—শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের ফেরত পাঠানো। এছাড়া আন্তসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারতের সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা। বাণিজ্য ও ট্রানজিট, জ্বালানি সহযোগিতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাও আলোচনার এজেন্ডায় রাখা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রত্যর্পণ ছাড়াও পানিবণ্টন চুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। নতুন করে চুক্তিতে ভারতের সঙ্গে অনেকদিন ধরে নেগোসিয়েশন চলছে। সেটা চূড়ান্ত হতে পারে।’’
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র বলছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ‘অনুকূল পরিবেশ’ নিয়ে প্রশ্ন আসছে। শেখ হাসিনাকে অবাধে সংবাদ সম্মেলন করতে দেওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে দেশ নিয়ে ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে বাধা তৈরি করছে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের পর ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। এর আগেও বেশ কয়েকবার কূটনৈতিকপত্রে শেখ হাসিনার বিষয়ে ভারতকে জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১৭ আগস্ট অবস্থান স্পষ্ট করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সম্ভাবনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যোগাযোগ রক্ষা করছে। যদিও, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ আগস্ট ভারতে সংবাদ সম্মেলন করার কারণে এই প্রক্রিয়াটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’’
মুখপাত্র বলেন, ‘‘আমরা এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি। আমাদের অভিমত হলো—এই সফরের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত হস্তান্তরের (প্রত্যর্পণ) অনুরোধ জানিয়েছি। বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির অভিযুক্ত খুনিদের হস্তান্তরের জন্যও ভারতের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে।’’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও বলেন, ‘‘সার্বভৌমত্ব, সমতা, জাতীয় মর্যাদা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে আমরা আমাদের ‘ব্যালেন্স ফার্স্ট’ (ভারসাম্য রক্ষা) নীতি অনুসরণ করে যাবো।’’
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ইতোমধ্যে ভারতকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। ভারত বলেছে, তারা প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী একাধিকবার বলছেন, আলোচনা করে সমাধান করা যাবে না, এমন কোনও সমস্যা নেই। দুই প্রধানমন্ত্রী আলোচনায় বসলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে। গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ করেন তিনি। সাক্ষাৎ শেষে ওইদিন বিকালেই দিল্লির উদ্দেশে রওনা হন তিনি। সাক্ষাতের বিষয়ে পরদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তিনি ব্রিফ করেন।
এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, এখানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করার পরে আমি সরাসরি দিল্লি গিয়েছিলাম এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি চমৎকার বৈঠক হয়েছে। তিনি (নরেন্দ্র মোদি) শুধু একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, আমাদের (দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী) দেখা করতে হবে। আপনি আমার পক্ষ থেকে তাদের বলতে পারেন, আপনার কাছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস রয়েছে, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন ভারত সফর করবেন, তখন তাকে এমন সম্মানজনক অভ্যর্থনা দেওয়া হবে, যা তিনি প্রাপ্য এবং এটি একটি স্মরণীয় সফর হবে। শেষ পর্যন্ত এর সুফল মানুষের কাছে যাবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে ঘিরে মন্তব্য করতে শুরু করেছেন ভারতের সাবেক কূটনীতিকরা। দেশটির সাবেক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বিদ্যাভূষণ সোনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘তারেক রহমানের সফর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদার এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।
ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি বলেছেন, তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য সময়ের সুযোগ খুবই সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে সফরকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করা অপ্রয়োজনীয়, অ-কূটনৈতিক এবং প্রত্যর্পণের উদ্দেশ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

