বঙ্গোপসাগরে নতুন করে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় দেশের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এর প্রভাবে আগামী কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বিভাগ ও এর সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার কয়েকটি নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা বা সাময়িক প্লাবনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
রোববার (১৬ আগস্ট) বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পৃথক পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় একটি নতুন লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এটি ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী ও ঘনীভূত হয়ে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে।
লঘুচাপের প্রভাবে দেশের ওপর মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি বায়ু প্রবল অবস্থায় থাকায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আগামী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগ এবং এর আশপাশের উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এরপরের ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
ফলে একদিকে যেমন দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির কারণে জনজীবনে ভোগান্তি বাড়তে পারে, অন্যদিকে পাহাড়ি ও নদীসংলগ্ন এলাকাগুলোতে পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। কারণ পাহাড়ি এলাকায় অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি হলে উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ দ্রুত বেড়ে যায়। এতে পাহাড়ি নদী ও ছড়াগুলোর পানি হঠাৎ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে এমন পরিস্থিতিতে সাময়িক প্লাবনের ঝুঁকি রয়েছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে অনেক সময় নদীর পানি স্বাভাবিক গতির চেয়ে দ্রুত বেড়ে যায়। তাই এসব এলাকার বাসিন্দাদের আবহাওয়া ও নদীর পানির সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরে উল্লেখযোগ্য ভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড না হলেও ভারতের মেঘালয়ের মাওকিরওয়াটে ৬৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। উজানে ভারী বৃষ্টি হলে তার প্রভাব সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানিপ্রবাহেও পড়তে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বর্তমানে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত ও সামনে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কারণে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হালদা নদীর পানিও বেড়েছে। আগামী দুই দিনে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এর ফলে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি বা সতর্কসীমায় পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
নদীর পানি দ্রুত বাড়লে নদীসংলগ্ন নিচু এলাকা প্লাবিত হতে পারে। তবে এ ধরনের প্লাবন সাময়িক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে পূর্বাভাসে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের শুধু সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নয়, আরও কয়েকটি নদীর পানিও আগামী দিনগুলোতে বাড়তে পারে। বর্তমানে গোমতী, মুহুরী, সেলোনিয়া ও ফেনী নদীর পানি কমতির দিকে রয়েছে। তবে উজান ও স্থানীয় এলাকায় বৃষ্টিপাত বেড়ে গেলে এসব নদীর পানিও দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ কারণে নদীর তীরবর্তী বসতি, কৃষিজমি এবং নিচু এলাকার মানুষের সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে টানা বৃষ্টির সময় নদীর পানির গতিবিধি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।
দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোতে আপাতত তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বর্তমানে কমছে।
সুরমা-কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি থাকলেও আগামী দুই থেকে তিন দিনে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা কম। এসব নদীর পানি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর পানিও কমছে। গঙ্গা ও পদ্মার পানিও বর্তমানে নিম্নমুখী রয়েছে। তবে আগামী দুই দিন পর গঙ্গা-পদ্মার পানি কিছুটা বাড়তে পারে। তারপরও তা বিপৎসীমার নিচেই থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৃষ্টির পাশাপাশি উপকূলীয় নদ-নদীগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উচ্চতার জোয়ারও পরিস্থিতিকে কিছুটা জটিল করে তুলতে পারে।
বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কীর্তনখোলা, লোহালিয়া-মেঘনা, পশুর, ইছামতী, কর্ণফুলী, লিটল ফেনী ও নোয়াখালী খালসহ বিভিন্ন নদী ও জলপথে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উচ্চতার জোয়ার চলছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দিন এসব উপকূলীয় নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উচ্চতার জোয়ার অব্যাহত থাকতে পারে।
উচ্চ জোয়ারের সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত যোগ হলে উপকূলীয় নিচু এলাকাগুলোতে পানি নিষ্কাশনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ফলে স্থানীয়ভাবে জলাবদ্ধতা বা সাময়িক পানিবন্দি পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হবে চট্টগ্রাম বিভাগ, বান্দরবান ও কক্সবাজারের নদীসংলগ্ন এলাকা এবং পাহাড়ি অঞ্চলের দিকে।
বিশেষ করে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বাড়লে নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলোতে পানি ঢুকে পড়তে পারে। পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে আকস্মিক ঢল ও স্থানীয়ভাবে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তাই এসব এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া নদী, খাল বা পাহাড়ি ছড়ার কাছাকাছি না যাওয়াই নিরাপদ। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ও আবহাওয়া বিভাগের সতর্কবার্তা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বঙ্গোপসাগরে নতুন লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশে বৃষ্টিপাত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম ও আশপাশের উজান এলাকায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি হতে পারে। পরে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বৃষ্টির প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বান্দরবান ও কক্সবাজারের কিছু নিচু এলাকায় সাময়িক প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে।
তবে দেশের উত্তরাঞ্চলের বড় নদীগুলোতে আপাতত পানি কমছে এবং গঙ্গা-পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায় বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা এখনো দেখা যায়নি।
আবহাওয়ার এমন পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে নদী ও পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকা জরুরি। ভারী বৃষ্টি শুরু হলে নদীর পানি কত দ্রুত বাড়ছে, সে বিষয়ে নজর রাখা এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলাই হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

