রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান মাহিনকে মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দীন আম্মারসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আরও ১৭ থেকে ১৮ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। আদালতে দায়ের হওয়া এই মামলাটি ইতোমধ্যে তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে পাঠানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজশাহী জেলার মতিহার থানা আমলি আদালতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান মাহিনের বাবা এম. এস. আসাদ উজ জামান বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। আদালতে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেন, তার ছেলের ওপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।
মামলায় মোট ৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দীন আম্মার, সালমান সাব্বির, নাজমুস সাকিব, মেহেদী সজীব, ফাহিম রেজা, আরিফুল ইসলাম, আহসান উল্লা ফারহান, সিফাত আবু সালেহ এবং নূরুল ইসলাম শহীদ। এছাড়া আরও ১৭ থেকে ১৮ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যাদের পরিচয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে হামলায় অংশ নেন এবং প্রত্যেকের নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল। এ কারণেই নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৭ জুলাই দুপুর আনুমানিক সাড়ে ১২টা থেকে ১টার মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতর এবং আশপাশের এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
সেই সময় মাহমুদুল হাসান মাহিন গ্রন্থাগারে বসে পড়াশোনা করছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, হঠাৎ করেই দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ১৯ থেকে ২০ জন ব্যক্তি তাকে ঘিরে ফেলেন। এরপর তাকে লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ হামলা চালানো হয়।
বাদীপক্ষের দাবি, হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ছিল মাহিনকে গুরুতরভাবে আহত করা নয়, বরং তাকে হত্যা করা।
আদালতে দাখিল করা মামলার এজাহারে হামলার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি সালাহউদ্দীন আম্মার লোহার রড দিয়ে মাহিনের মাথা ও কপালে একাধিকবার আঘাত করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
এছাড়া ২ নম্বর আসামি সালমান সাব্বিরের আঘাতে মাহিনের বাম চোখে মারাত্মক জখম হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
৩ নম্বর আসামি নাজমুস সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তার আঘাতে মাহিনের বুকের হাড় ভেঙে যায়।
৪ নম্বর আসামি মেহেদী সজীব মাহিনের পিঠে আঘাত করেন বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া অন্যান্য অভিযুক্তরা বাঁশের লাঠিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। হামলার সময় মাহিন আত্মরক্ষার চেষ্টা করলেও সংখ্যায় বেশি হওয়ায় তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি বলে বাদীপক্ষ দাবি করেছে।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, একপর্যায়ে মারধরের ফলে মাহিন মাটিতে পড়ে যান। কিন্তু এরপরও হামলা থামেনি।
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েকজন হামলাকারী তার বুক ও গলার ওপর উঠে বসে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করেন। এতে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে।
এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত কিছু ব্যক্তি এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। পরে আহত মাহিনকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার জন্য একটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়।
মামলার এজাহারে একটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে যে, আহত অবস্থায় মাহিনকে যখন অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল, তখনও হামলাকারীরা তাকে ছাড়েননি।
অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা অ্যাম্বুলেন্সের পথরোধ করে মাহিনকে জোরপূর্বক নিচে নামিয়ে আবারও মারধর করেন।
পরে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় তাকে পুনরায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় এবং সেখানে ভর্তি করা হয়।
বাদীপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে তার জীবন আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারত।
মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনার পরদিন অর্থাৎ ২৮ জুলাই ভুক্তভোগীর বাবা এম. এস. আসাদ উজ জামান মতিহার থানায় গিয়ে মামলা করার চেষ্টা করেন।
তবে তার অভিযোগ, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামলাটি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
এরপর আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালতে অভিযোগ দাখিল করার পর বিচারক বিষয়টি বিবেচনায় নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নির্দেশ না দিয়ে তদন্তের জন্য মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে পাঠিয়ে দেন।
আদালত মামলাটি সরাসরি গ্রহণ করে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেননি।
বরং অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
তদন্ত শেষে পিবিআই আদালতে প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হযরত আলী মামলার বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, আদালত অভিযোগটি গ্রহণ করলেও সঙ্গে সঙ্গে কোনো আদেশ দেননি। বরং অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়ে পিবিআইয়ের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তার দাবি, অভিযোগকারী আবেগপ্রবণ হয়ে এই মামলা দায়ের করেছেন।
তিনি আরও বলেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে এবং তখন বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। তার মতে, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্তই এ মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘটিত এই ঘটনাটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন সহিংসতার অভিযোগ উদ্বেগ তৈরি করেছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
এখন মামলার তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে, হামলার সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন, অভিযোগের সত্যতা কতটা প্রমাণিত হয় এবং তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত কী সিদ্ধান্ত নেয় সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট সবার।

