পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক পাখির কথা উঠলেই প্রথমেই যে নামটি সামনে আসে, সেটি হলো ক্যাসোওয়ারি (Cassowary)। বিশাল দেহ, ক্ষুরধার নখ এবং প্রয়োজনে প্রাণঘাতী লাথি— সব মিলিয়ে এই উড়তে না-পারা পাখিটি বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানী ও বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। তবে এবার ক্যাসোওয়ারিকে নিয়ে সামনে এসেছে আরও বিস্ময়কর এক তথ্য। গবেষণায় জানা গেছে, এই পাখির মাথার ওপরের শক্ত ঝুঁটির মতো অংশ অন্ধকার পরিবেশে অতিবেগুনি আলোর প্রভাবে উজ্জ্বল নীল-সবুজ আভায় জ্বলে উঠতে পারে। এই আবিষ্কার ইতোমধ্যেই বিজ্ঞান জগতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ক্যাসোওয়ারির আবাস মূলত অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পাপুয়া নিউগিনি এবং ইন্দোনেশিয়ার ঘন রেইনফরেস্ট। এরা উড়তে পারে না, কিন্তু গঠন ও শক্তিতে অনেক বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীকেও টেক্কা দিতে পারে।
একটি পূর্ণবয়স্ক ক্যাসোওয়ারির উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। ওজন অনেক সময় ৭০ কেজিরও বেশি হয়। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, প্রতিটি পায়ে প্রায় ৫ ইঞ্চি লম্বা ছুরির ধার মতো নখ থাকে। বিপদের সময় এই নখ ব্যবহার করে প্রচণ্ড শক্তিতে লাথি মারতে পারে তারা।
যদিও মানুষের ওপর হামলার ঘটনা খুবই কম, তবুও যদি কেউ তাদের কোণঠাসা করে ফেলে অথবা বাচ্চার কাছে চলে যায়, তাহলে মুহূর্তের মধ্যেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে এই পাখি। তাই বন বিশেষজ্ঞরা সবসময় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্য ডোবার পর জঙ্গলে অযথা ঘোরাফেরা না করাই নিরাপদ। কারণ অন্ধকারে অনেক প্রাণীর আচরণ বদলে যায়। ক্যাসোওয়ারির ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের মাথার ওপরের শক্ত অংশটি উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে। যদিও সাধারণ মানুষের চোখে এটি সবসময় ধরা পড়ে না, তবুও অতিবেগুনি আলোর উপস্থিতিতে এই বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ক্যাসোওয়ারির মাথার ওপর থাকা হেলমেটের মতো শক্ত অংশটির নাম ক্যাস্ক (Casque)। এটি মূলত হাড় এবং কেরাটিন দিয়ে তৈরি। অনেকটা শিংয়ের মতো দেখতে এই অংশটি ধনেশ পাখির মাথাতেও দেখা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন, ক্যাস্ক হয়তো ঘন জঙ্গলের ডালপালা সরিয়ে চলতে সাহায্য করে। আবার কেউ কেউ মনে করতেন, এটি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কিংবা শব্দ তৈরিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু এতদিন এর প্রকৃত কাজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জীবিত এবং জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাসোওয়ারির মাথা অতিবেগুনি আলোতে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার ফলাফল ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর।
তারা দেখতে পান, ক্যাস্কে রয়েছে জৈব ফ্লুরোসেন্স (Biofluorescence)। অর্থাৎ অতিবেগুনি রশ্মি পড়লে ক্যাস্কের নির্দিষ্ট অংশ উজ্জ্বল নীল-সবুজ আলো বিচ্ছুরণ করে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, সব ক্যাসোওয়ারির ফ্লুরোসেন্ট নকশা এক নয়। বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে এই আলোকচ্ছটা ও নকশার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা গেছে। ফলে বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বৈশিষ্ট্যের বিশেষ কোনো জৈবিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ক্যাসোওয়ারির চোখ প্রায় ৩৬৫ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অতিবেগুনি আলো শনাক্ত করতে সক্ষম।
শুধু তাই নয়, তাদের ক্যাস্ক সেই আলো প্রতিফলিতও করে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এক ক্যাসোওয়ারি অন্য ক্যাসোওয়ারির জ্বলজ্বলে ক্যাস্ক দেখতে পারে। যদিও বিষয়টি এখনও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবুও এটি গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
রেইনফরেস্টের ভেতরে সূর্যের আলো খুব কম পৌঁছায়। এমন পরিবেশে সাধারণ রঙ বা সংকেত অনেক সময় কার্যকর হয় না।
বিজ্ঞানীদের মতে, ক্যাস্কের এই জৈব ফ্লুরোসেন্স হয়তো একই প্রজাতির সদস্যদের একে অপরকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে। এটি সঙ্গী নির্বাচন, এলাকা চিহ্নিত করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমও হতে পারে।
তবে এসবই এখন পর্যন্ত গবেষকদের বৈজ্ঞানিক অনুমান। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
জৈব ফ্লুরোসেন্স সাধারণত সামুদ্রিক প্রাণীদের ক্ষেত্রে বেশি পরিচিত। কিন্তু স্থলভাগে বসবাসকারী এত বড় একটি পাখির শরীরে এমন বৈশিষ্ট্য পাওয়া বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এই আবিষ্কার শুধু ক্যাসোওয়ারির আচরণ সম্পর্কে নতুন ধারণাই দিচ্ছে না, বরং পাখিদের বিবর্তন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন সম্পর্কেও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, ক্যাসোওয়ারি স্বাভাবিকভাবে মানুষের ওপর আক্রমণ করতে চায় না। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে যখন মানুষ খুব কাছে চলে যায়, খাবার দেওয়ার চেষ্টা করে অথবা তাদের বাচ্চার কাছে পৌঁছে যায়।
তাই যদি কখনও রেইনফরেস্টে ক্যাসোওয়ারির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। কোনো অবস্থাতেই তাদের উত্ত্যক্ত করা বা কাছে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়।
বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় এবং বিপজ্জনক পাখি ক্যাসোওয়ারিকে নিয়ে নতুন এই গবেষণা প্রমাণ করেছে, প্রকৃতি এখনও অসংখ্য অজানা বিস্ময়ে ভরা। মাথার ওপরের ক্যাস্কের জৈব ফ্লুরোসেন্স শুধু একটি নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়, বরং এটি প্রাণীদের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিবর্তন নিয়ে গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
আগামী দিনে আরও বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে হয়তো জানা যাবে, অন্ধকার রেইনফরেস্টে জ্বলে ওঠা এই নীল-সবুজ আভা আসলে ক্যাসোওয়ারির জীবনে কী ভূমিকা পালন করে। ততদিন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এই পাখিকে ঘিরে রহস্য এবং কৌতূহল আরও বাড়তেই থাকবে।

