বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আবারও নিজেদের লড়াকু মানসিকতার প্রমাণ দিল আর্জেন্টিনা। কঠিন প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে লিওনেল স্কালোনির দল। ম্যাচের নায়ক হয়ে উঠেছেন জুলিয়ান আলভারেজ, যাঁর দুর্দান্ত দূরপাল্লার গোল অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একই সঙ্গে লিওনেল মেসি গড়েছেন নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপে নিজের দশম অ্যাসিস্ট করে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনার রেকর্ড।
ম্যাচের প্রথম বাঁশি থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে শুরু করে আর্জেন্টিনা। বলের দখল নিজেদের কাছে রেখে একের পর এক আক্রমণ সাজাতে থাকে নীল-সাদা জার্সিধারীরা। সেই চাপের ফলও আসে খুব দ্রুত।
প্রথম গোলটি আসে কর্নার কিক থেকে। লিওনেল মেসির নিখুঁত ক্রসে দুর্দান্ত হেডে বল জালে পাঠান অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। গোলটির মাধ্যমে শুধু আর্জেন্টিনাই এগিয়ে যায়নি, ইতিহাসও গড়েছেন মেসি। বিশ্বকাপে এটি ছিল তাঁর দশম অ্যাসিস্ট, যা দিয়ে তিনি ভেঙে দেন দিয়েগো মারাদোনার দীর্ঘদিনের রেকর্ড।
গোলের পর মনে হচ্ছিল আর্জেন্টিনা আরও আধিপত্য বিস্তার করবে। কিন্তু ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে সুইজারল্যান্ড।
প্রথম গোল হজমের পর সুইজারল্যান্ড আত্মবিশ্বাস হারায়নি। বরং দ্রুত পাল্টা আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে ফেলতে শুরু করে। একাধিকবার গোলের সুযোগও তৈরি করে তারা।
এই সময় আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো “এমি” মার্টিনেজ। বিশেষ করে প্রথমার্ধের ৪১ মিনিটে একেবারে এক-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে তাঁর অসাধারণ সেভ ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যদি সেই সুযোগে গোল হয়ে যেত, তাহলে ম্যাচের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।
প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-০ ব্যবধানে আর্জেন্টিনার এগিয়ে থেকে। তবে খেলায় সুইজারল্যান্ডের লড়াই ছিল চোখে পড়ার মতো।
বিরতির পর আরও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলতে নামে সুইজারল্যান্ড। তারা ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে এবং আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রাখে।
শেষ পর্যন্ত ৬৭ মিনিটে তাদের সেই প্রচেষ্টার ফল মেলে। দারুণ দলগত আক্রমণ থেকে এনডয়ে গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরান। গোলটি পুরো স্টেডিয়ামে নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়।
সমতা ফেরানোর পর ম্যাচের গতি অনেকটাই সুইজারল্যান্ডের দিকেই ঝুঁকে পড়েছিল। আর্জেন্টিনা তখন কিছুটা চাপে পড়ে যায়।
ম্যাচের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে ৭২ মিনিটে। সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলো দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। ফলে শেষ প্রায় ২০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময়ের পুরোটা ১০ জন নিয়ে খেলতে হয় সুইসদের।
সংখ্যাগত সুবিধা পেলেও নির্ধারিত সময়ে গোল আদায় করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। সুইজারল্যান্ডের রক্ষণ ছিল অসাধারণ সংগঠিত। তাদের দৃঢ়তা দেখে মনে হচ্ছিল ম্যাচটি হয়তো গড়াবে টাইব্রেকারে।
যখন সবাই পেনাল্টি শুটআউটের অপেক্ষায়, ঠিক তখনই জ্বলে ওঠেন জুলিয়ান আলভারেজ।
অতিরিক্ত সময়ে বক্সের অনেক বাইরে থেকে নেওয়া তাঁর দুর্দান্ত শট সোজা জালে গিয়ে জড়ায়। গোলটি ছিল নিখুঁত, শক্তিশালী এবং দর্শনীয়। সুইস গোলরক্ষকের কোনো সুযোগই ছিল না।
এই গোলের পর আর্জেন্টিনা নতুন উদ্যমে খেলতে শুরু করে। সুইজারল্যান্ড মরিয়া হয়ে সমতা ফেরানোর চেষ্টা করলেও তাদের রক্ষণে ফাঁক তৈরি হয়।
সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে লাউতারো মার্টিনেজ আরও একটি গোল করেন। তাঁর গোলে ম্যাচ পুরোপুরি আর্জেন্টিনার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ৩-১ গোলের জয় নিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে লিওনেল মেসির দল।
এই ম্যাচে গোল না করলেও লিওনেল মেসির অবদান ছিল অসাধারণ। তাঁর সৃজনশীল পাস, বল নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্ব পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রেখেছে।
ম্যাক অ্যালিস্টারের গোলে অ্যাসিস্ট করে তিনি বিশ্বকাপে নিজের দশম অ্যাসিস্টের কীর্তি গড়েন। এর মাধ্যমে তিনি ছাড়িয়ে যান আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো মারাদোনাকে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টের ক্ষেত্রেও মেসি এখন অন্যতম সফল ফুটবলার। প্রতিটি ম্যাচেই তিনি নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে নিজের কিংবদন্তি মর্যাদাকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছেন।
আলভারেজের গোল যতটা আলোচনায় এসেছে, ততটাই প্রশংসার দাবিদার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ম্যাচজুড়ে একাধিক নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করে দেন তিনি।
বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর কয়েকটি অসাধারণ সেভ আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখে। বড় ম্যাচে চাপ সামলানোর দক্ষতা আবারও প্রমাণ করেছেন এই বিশ্বকাপজয়ী গোলরক্ষক।
সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড। শক্তিশালী স্কোয়াড, দ্রুতগতির আক্রমণ এবং দুর্দান্ত মিডফিল্ড নিয়ে ইংল্যান্ড ইতোমধ্যেই নিজেদের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অন্যদিকে আর্জেন্টিনা আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। মেসির নেতৃত্ব, আলভারেজের ফর্ম, লাউতারোর গোল করার ক্ষমতা এবং এমি মার্টিনেজের নির্ভরযোগ্য পারফরম্যান্স দলটিকে বাড়তি শক্তি দিচ্ছে।
বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন এখনও জীবন্ত রয়েছে আর্জেন্টিনার। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে এই জয় সহজ ছিল না। প্রতিপক্ষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে এবং দীর্ঘ সময় আর্জেন্টিনাকে চাপে রেখেছে। কিন্তু বড় দলের মতোই সংকটের মুহূর্তে নিজেদের সেরাটা দেখিয়েছে লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা।
জুলিয়ান আলভারেজের দুর্দান্ত গোল, এমি মার্টিনেজের অবিশ্বাস্য সেভ এবং লিওনেল মেসির ইতিহাস গড়া অ্যাসিস্ট মিলিয়ে এটি বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ হয়ে থাকবে। এখন সবার চোখ সেমিফাইনালের দিকে, যেখানে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরেকটি রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।

