বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যখন দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে, তখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০২৬ সালের এল নিনো। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এবারের এল নিনো গত দেড় শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী তো বটেই, এমনকি অতীতের সব রেকর্ডও ছাপিয়ে যেতে পারে। সেই কারণেই একে অনেক গবেষক “সুপার এল নিনো” বা “গডজিলা এল নিনো” বলেও উল্লেখ করছেন।
যদি বিজ্ঞানীদের এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তাহলে বিশ্বের বহু দেশেই তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, খরা, বন্যা এবং কৃষিক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ভারতও এর বাইরে থাকবে না।
এল নিনো হল প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন বদলে যায়।
এর বিপরীত অবস্থাকে বলা হয় লা নিনা, যেখানে সমুদ্রের জল স্বাভাবিকের তুলনায় ঠান্ডা থাকে। সাধারণত এল নিনো এবং লা নিনা কয়েক বছর অন্তর অন্তর পালাক্রমে দেখা দেয় এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার উপর বড় প্রভাব ফেলে।
২০২৬ সালের শুরুতে প্রশান্ত মহাসাগরে লা নিনার প্রভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এল নিনোর প্রভাব বাড়তে থাকে এবং বর্তমানে সেটিই প্রধান জলবায়ুগত অবস্থায় পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর গোলার্ধে নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে এই এল নিনো সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। সেই সময় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞানীরা অতীতের প্রায় ১৫০ বছরের জলবায়ুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, এই সময়ের মধ্যে মাত্র কয়েকবার অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো দেখা গিয়েছিল। তবে চলতি বছরের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তাঁদের ধারণা, ২০২৬ সালের এল নিনো সেই ঘটনাগুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই কারণেই অনেক গবেষক একে “সুপার এল নিনো” বা “গডজিলা এল নিনো” নামে অভিহিত করছেন। এই নামগুলোর উদ্দেশ্য হলো এর সম্ভাব্য তীব্রতা সম্পর্কে সতর্ক করা।
বর্তমান সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন এবং প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে এল নিনোর শক্তি এখনও বাড়ার দিকেই এগোচ্ছে।
জলবায়ু গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বলছে, গত দেড় শতকে মাত্র কয়েকটি এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি সেই সব রেকর্ডকেও অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও কোনও প্রাকৃতিক ঘটনাকে শতভাগ নিশ্চিতভাবে আগাম বলা যায় না, তবুও বর্তমান তথ্য ও জলবায়ু মডেলগুলোর বিশ্লেষণ বিজ্ঞানীদের যথেষ্ট উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
যদি পূর্বাভাস বাস্তবে পরিণত হয়, তাহলে ২০২৬ সালের এল নিনো ইতিহাসে অন্যতম শক্তিশালী জলবায়ুগত ঘটনা হিসেবে স্থান পেতে পারে।
ভারতে ইতিমধ্যেই এল নিনোর প্রভাব অনুভূত হতে শুরু করেছে বলে জানাচ্ছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা।
দেশের কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলেও সামগ্রিকভাবে মৌসুমি বৃষ্টিপাত এখনও স্বাভাবিকের তুলনায় কম রয়েছে। এল নিনোর কারণে বর্ষার বৃষ্টির বণ্টনে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা দিতে পারে।
ফলে কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টি, আবার কোথাও দীর্ঘ সময় বৃষ্টির অভাব দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া কৃষি, পানীয় জলের সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
শক্তিশালী এল নিনোর কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
অনেক অঞ্চলে তীব্র গরম, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং দাবানলের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। আবার কিছু এলাকায় অতিবৃষ্টি, ভূমিধস এবং বন্যার আশঙ্কাও বাড়বে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। মাছের উৎপাদন কমে যাওয়া, প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।
ভারতের মতো কৃষিনির্ভর দেশগুলিতে এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় কৃষিক্ষেত্রে।
বর্ষার অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ধান, ডাল, শাকসবজি এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে খাদ্যশস্যের সরবরাহ কমে গেলে বাজারে দাম বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞরা তাই আগাম পরিকল্পনা, জল সংরক্ষণ এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী কৃষিকাজ পরিচালনার পরামর্শ দিচ্ছেন।
গবেষকদের মতে, এল নিনো একটি স্বাভাবিক জলবায়ুগত প্রক্রিয়া হলেও বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। তাই পরিস্থিতির উপর নিয়মিত নজর রাখা এবং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সব পূর্বাভাসই সম্ভাবনার ভিত্তিতে তৈরি হয়। তবে বর্তমান তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের এল নিনোকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
২০২৬ সালের সম্ভাব্য সুপার এল নিনো এখন বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের অন্যতম আলোচনার বিষয়। প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, পরিবর্তিত আবহাওয়ার ধরণ এবং জলবায়ু মডেলের বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি গত ১৫০ বছরের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।
ভারতসহ বিশ্বের বহু দেশে এর প্রভাব পড়তে পারে বৃষ্টিপাত, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, তাপমাত্রা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর। যদিও পরিস্থিতি এখনও পর্যবেক্ষণের পর্যায়ে রয়েছে, তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে এখন থেকেই সচেতনতা ও প্রস্তুতি বাড়ানোই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

