ফুটবল বিশ্বে বড় ম্যাচ মানেই কৌশল, পরিকল্পনা এবং মানসিক লড়াই। বিশেষ করে নকআউট পর্বে পেনাল্টি শুটআউটের সম্ভাবনা মাথায় রেখে গোলরক্ষকরা আগে থেকেই নানা প্রস্তুতি নেন। সম্প্রতি এমনই এক প্রস্তুতির ছবি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডন পিকফোর্ডের জলের বোতলে লাগানো একটি ‘পেনাল্টি চিট শিট’ ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের হাতে পৌঁছায়। সেটি দেখেই লিওনেল মেসি, এনজো ফার্নান্দেজসহ সতীর্থদের হাসির মুহূর্ত এখন ভাইরাল।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। ম্যাচ নির্ধারিত সময়েই শেষ হয়ে যাওয়ায় পেনাল্টি শুটআটের প্রয়োজন পড়েনি। ফলে ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জর্ডন পিকফোর্ডের বিশেষ প্রস্তুতি মাঠে কাজে লাগানোর সুযোগই আসেনি।
তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সেই প্রস্তুতিই হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার কোচিং স্টাফের একজন পিকফোর্ডের ব্যবহৃত জলের বোতলটি সংগ্রহ করেন। পরে সেটি লিওনেল মেসি, এনজো ফার্নান্দেজ এবং আরও কয়েকজন ফুটবলারের হাতে পৌঁছায়।
বোতলের গায়ে লাগানো ছিল একটি ছোট্ট নোট বা ‘পেনাল্টি চিট শিট’। সেখানে আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য পেনাল্টি শুটারদের নামের পাশাপাশি উল্লেখ ছিল তারা সাধারণত গোলের কোন দিকে শট নিতে পছন্দ করেন। প্রতিটি খেলোয়াড়ের শট নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সেখানে লেখা ছিল।
নোটটি পড়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা একে অপরকে দেখাতে থাকেন এবং হাসিতে ফেটে পড়েন। সেই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়।
আধুনিক ফুটবলে পেনাল্টি শুটআট এখন অনেকটাই পরিসংখ্যান ও বিশ্লেষণনির্ভর। ম্যাচের আগে ভিডিও বিশ্লেষক এবং কোচিং স্টাফ প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের শত শত পেনাল্টি শট বিশ্লেষণ করেন।
সেই তথ্যের সারসংক্ষেপ ছোট কাগজে লিখে গোলরক্ষকের জলের বোতলে লাগিয়ে দেওয়া হয়। এতে চাপের মুহূর্তে গোলকিপার সহজেই দেখে নিতে পারেন কোন খেলোয়াড় সাধারণত ডান দিকে, বাঁ দিকে কিংবা মাঝখানে শট নেন।
এই কৌশল এখন আন্তর্জাতিক ফুটবলে খুবই পরিচিত এবং বিশ্বের অনেক শীর্ষ গোলরক্ষক এটি ব্যবহার করে থাকেন।
জর্ডন পিকফোর্ডের জন্য এটি নতুন কোনো কৌশল নয়। অতীতেও তিনি একই ধরনের ‘পেনাল্টি চিট শিট’ ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সাফল্য পেয়েছেন।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে ইংল্যান্ডকে জয় এনে দেন তিনি। সেই ম্যাচেও প্রতিপক্ষের শুটারদের তথ্যসংবলিত নোট ব্যবহার করেছিলেন।
এছাড়া ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যানুয়েল আকাঞ্জির পেনাল্টি ঠেকানোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রস্তুতি তাকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল বলে আলোচনা রয়েছে।
আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের হাসির পেছনে মূল কারণ ছিল একটি মজার বাস্তবতা। এত নিখুঁত পরিকল্পনা এবং বিশদ প্রস্তুতি নেওয়া হলেও ম্যাচে পেনাল্টি শুটআটের সুযোগই তৈরি হয়নি।
ফলে পিকফোর্ডের পুরো প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েনি। সেই কারণেই বোতলের নোটটি দেখে মেসি ও তাঁর সতীর্থরা হালকা মেজাজে বিষয়টি উপভোগ করেন।
এই ঘটনাটি ফুটবলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও খেলোয়াড়দের বন্ধুত্বপূর্ণ ও মানবিক দিকটি ফুটিয়ে তুলেছে।
ম্যাচের বেশিরভাগ সময় পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ড এগিয়ে থাকায় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন ম্যাচটি তাদের দিকেই ঝুঁকছে।
কিন্তু শেষ কয়েক মিনিটে বদলে যায় পুরো চিত্র। মাত্র সাত মিনিটের ব্যবধানে আর্জেন্টিনা দুটি গোল করে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। গোল দুটি করেন এনজো ফার্নান্দেজ এবং লাউতারো মার্টিনেজ। দুটি গোলের পেছনেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন লিওনেল মেসি, যার নিখুঁত পাস ও আক্রমণভাগের নেতৃত্ব ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এই দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে আর্জেন্টিনা আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে।
ম্যাচের পর মেসিদের হাতে পিকফোর্ডের জলের বোতল পৌঁছানোর ভিডিওটি ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। কেউ বিষয়টিকে মজার ঘটনা হিসেবে দেখেছেন, আবার অনেকে বলেছেন এটি আধুনিক ফুটবলে তথ্য-ভিত্তিক প্রস্তুতির একটি বাস্তব উদাহরণ।
অনেক সমর্থকের মতে, পেনাল্টি শুটআট না হলেও পিকফোর্ডের প্রস্তুতি তার পেশাদার মানসিকতারই প্রমাণ। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ভিডিওটিকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
জর্ডন পিকফোর্ডের ‘পেনাল্টি চিট শিট’ হয়তো এই ম্যাচে ব্যবহার করার সুযোগ আসেনি, কিন্তু সেটি আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত প্রস্তুতির একটি চমৎকার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে লিওনেল মেসি ও তাঁর সতীর্থদের হাস্যরসাত্মক প্রতিক্রিয়া ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এনে দিয়েছে এক ভিন্ন আনন্দের মুহূর্ত।
মাঠের লড়াই যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, তেমনি মাঠের বাইরের এমন ছোট ছোট ঘটনাও ফুটবলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। তাই পিকফোর্ডের সেই ছোট্ট জলের বোতল এবং তাতে লাগানো ‘চিট শিট’ এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত ভাইরাল মুহূর্তে পরিণত হয়েছে।

