বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এমন নাটকীয় প্রত্যাবর্তন খুব কমই দেখা যায়। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও অবিশ্বাস্য লড়াই করে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই উচ্ছ্বাসে ভেসে ওঠে গোটা দল। কিন্তু সেই আনন্দের মাঝেও দেখা যায় এক ভিন্ন ছবি। দলের অধিনায়ক লিয়োনেল মেসির চোখে জল। সাধারণত বিদায়ের বেদনায় ফুটবলারদের কাঁদতে দেখা গেলেও, জয়ের পর আবেগে ভেঙে পড়া মেসির ছবি মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে।
ম্যাচ শেষে সেই কান্নার কারণ নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। পাশাপাশি স্বীকার করেছেন, ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পেনাল্টি নষ্ট করার জন্য নিজের ওপর প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছিল আর্জেন্টিনা। একাধিক সুযোগ তৈরি হলেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না তারা। এর মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি পায় দল। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন মেসি। তার শট প্রতিহত করেন প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক।
ম্যাচ শেষে এই প্রসঙ্গে মেসি বলেন, পেনাল্টি মিস করার পর তিনি নিজের ওপর ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। তার মতে, শট নেওয়ার ধরন একেবারেই সঠিক ছিল না। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, নিজের ভুলের কারণে হয়তো দল বড় ক্ষতির মুখে পড়বে।
তিনি আরও জানান, একজন অধিনায়ক হিসেবে এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব আরও বেশি অনুভব করেন। তাই পেনাল্টি নষ্ট হওয়ার পর মানসিকভাবে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তাকে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে আর্জেন্টিনা আগে কখনও নকআউট ম্যাচে দুই গোলে পিছিয়ে থেকে জয় পায়নি। এমনকি অতীতে এমন পরিস্থিতি থেকে সমতাও ফেরাতে পারেনি দলটি।
কিন্তু এবার ইতিহাস বদলে দিলেন মেসি ও তার সতীর্থরা।
মিশর শুরুতেই দুই গোল করে আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলে দেয়। পুরো স্টেডিয়াম তখন যেন হতবাক। কিন্তু হাল ছাড়েনি আর্জেন্টিনা। ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসে তারা। একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে ফেলে। সমতা ফেরানোর গুরুত্বপূর্ণ গোলটি করেন মেসি নিজেই। এরপর সংযুক্তি সময়ে আসে জয়সূচক গোল। সেই গোলেই নিশ্চিত হয় কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।
মেসির কথায়, সমতা ফেরানোর গোলটি তার কাছে শুধুই একটি গোল ছিল না। সেটিই তাকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।
তিনি বলেন, দিনের শেষে মনে হয়েছে ঈশ্বর তার জন্য ভালো কিছুই লিখে রেখেছিলেন। পেনাল্টি মিসের হতাশা কাটিয়ে সমতার গোল করতে পারায় তিনি অসাধারণ শান্তি অনুভব করেছেন। সেই আবেগ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এই গোলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর আর্জেন্টিনা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নেয়।
মেসির মতে, ম্যাচের ফলাফল দেখে মনে হলেও শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা ভালো ফুটবল খেলছিল। প্রতিপক্ষ গোল করার পরও দল ভেঙে পড়েনি। বরং আরও বেশি আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং জুলিয়ান আলভারেজ একাধিক দারুণ সুযোগ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু মিশরের গোলরক্ষক অসাধারণ দক্ষতায় কয়েকটি নিশ্চিত গোল রুখে দেন। গোললাইন থেকে করা তার কয়েকটি সেভ ম্যাচকে দীর্ঘ সময় প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল।
মেসির বিশ্বাস, এত সুযোগ তৈরি করার পর আর্জেন্টিনার জয় পুরোপুরি প্রাপ্য ছিল।
এই বিশ্বকাপে এটি প্রথম নয়, যখন কঠিন পরিস্থিতি থেকে জয় ছিনিয়ে আনল আর্জেন্টিনা। এর আগে কাবো ভার্দের বিরুদ্ধেও একই ধরনের চাপে পড়েছিল দলটি। সেই ম্যাচেও অতিরিক্ত সময়ে গোল করে জয় নিশ্চিত করতে হয়েছিল।
মিশরের বিপক্ষেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে সমর্থকদের। সংযুক্তি সময়ে পাওয়া জয়সূচক গোল আবারও প্রমাণ করেছে, শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত এই আর্জেন্টিনাকে হারানো সহজ নয়।
তবে একই সঙ্গে এই দুটি ম্যাচ আর্জেন্টিনার কিছু দুর্বলতাও সামনে এনে দিয়েছে। বিশেষ করে রক্ষণভাগের ভুল এবং ম্যাচের শুরুতে মনোযোগের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
যদিও নাটকীয় জয় আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়িয়েছে, তবুও কোয়ার্টার ফাইনালের আগে দলকে আরও সতর্ক থাকতে হবে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শুরুতেই পিছিয়ে পড়লে ফিরে আসা সব সময় সম্ভব নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রমণভাগ দুর্দান্ত হলেও রক্ষণে আরও শৃঙ্খলা প্রয়োজন। পাশাপাশি সহজ সুযোগ নষ্ট করার প্রবণতাও কমাতে হবে। মেসির পেনাল্টি মিস সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলে লিয়োনেল মেসিকে শুধু তার গোল বা রেকর্ডের জন্যই আলাদা করে দেখা হয় না। দলের প্রতি তার দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্ববোধও তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
এই ম্যাচেও তার কান্না ছিল না শুধুই আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। সেটি ছিল আত্মসমালোচনা, দায়িত্ববোধ এবং দলকে জেতানোর তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। একজন বিশ্বসেরা ফুটবলারের কাছ থেকেও ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দলকে জয়ের পথে ফেরানোই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়।
কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও আর্জেন্টিনার সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচই এখন ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ। মেসি ও তার সতীর্থরা যদি একই লড়াকু মানসিকতা ধরে রাখতে পারেন এবং রক্ষণে ভুল কমাতে পারেন, তাহলে শিরোপার লড়াইয়ে তারা অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার হয়েই থাকবে।
মিশরের বিরুদ্ধে এই ম্যাচ শুধু একটি জয় নয়, বরং আর্জেন্টিনার মানসিক দৃঢ়তা, লড়াই করার ক্ষমতা এবং অধিনায়ক মেসির নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে। পেনাল্টি মিসের হতাশা থেকে চোখের জলে ভেসে ওঠা আবেগ, তারপর সমতার গোল এবং শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক জয়—সব মিলিয়ে এটি বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ হিসেবে দীর্ঘদিন ফুটবলপ্রেমীদের মনে জায়গা করে নেবে।

