বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। দুর্দান্ত লড়াইয়ের পর মিশরকে হারিয়ে শেষ আটে উঠেছে লিওনেল মেসির দল। তবে ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে অন্য একটি ঘটনা। মিশরের প্রধান কোচ হোসেম হাসানের একটি ইঙ্গিত ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক, যেখানে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি।
যদিও বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে, এখন পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল বা প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। ফলে ঘটনাটি নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনা তৃতীয় গোল করার পর লিওনেল মেসিকে মিশরের ডাগআউটের দিকে যেতে দেখা যায়। সেখানে তিনি কোচ হোসেম হাসানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কথা বলেন।
এর কিছুক্ষণ পরই হাসান দুই হাত ক্রস করে ইংরেজি অক্ষর ‘X’-এর মতো একটি ইঙ্গিত করেন। এই দৃশ্য সম্প্রচার ক্যামেরায় ধরা পড়তেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। অনেকেই এই ইঙ্গিতের সঙ্গে বর্ণবিদ্বেষবিরোধী সংকেতের সম্পর্ক টেনে নানা ব্যাখ্যা দিতে শুরু করেন।
তবে কোচ হাসান ওই মুহূর্তে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও বিস্তারিত মন্তব্য করেননি। একইভাবে মেসিও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া জানাননি।
কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মেসি নাকি মিশরের কোচকে বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে এখনও পর্যন্ত কোনও অডিও, ভিডিও বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
ফিফাও এ বিষয়ে কোনও ভিডিও ফুটেজ বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেনি, যেখানে এমন অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে বিষয়টি মূলত জল্পনা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
কোনও নিরপেক্ষ তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়া অভিযোগকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
ফুটবলে ‘X’ ইঙ্গিতটি সাম্প্রতিক সময়ে বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
২০২৪ সালে ফিফা এই সংকেত চালু করে, যাতে মাঠে কোনও ফুটবলার, কোচ, কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বর্ণবিদ্বেষী আচরণের শিকার হলে দ্রুত রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন।
এই সংকেত দেখানোর মাধ্যমে ম্যাচ পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন যে মাঠে একটি গুরুতর বৈষম্যমূলক ঘটনা ঘটেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
ফিফার বর্ণবিদ্বেষবিরোধী প্রটোকল অনুযায়ী, কেউ যদি এই সংকেত ব্যবহার করেন, তাহলে রেফারি পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে পারেন।
প্রয়োজনে ম্যাচ সাময়িকভাবে বন্ধ করা হতে পারে। স্টেডিয়ামের ঘোষণার মাধ্যমে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বর্ণবিদ্বেষমূলক আচরণ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে খেলা পুনরায় শুরু করা হয়।
অবস্থা আরও গুরুতর হলে ম্যাচ স্থগিত বা পরিত্যক্ত করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নেওয়া যেতে পারে।
তবে আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচে এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ম্যাচ স্বাভাবিকভাবেই শেষ হয়েছে এবং রেফারিও খেলা থামানোর প্রয়োজন মনে করেননি।
এটাই প্রথম নয়, বড় কোনও টুর্নামেন্টে মেসিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচ শেষে প্রতিপক্ষের ডাগআউটের সামনে গিয়ে মেসির কিছু অঙ্গভঙ্গি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। সেই সময়ও তাঁর আচরণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতভেদ দেখা যায়।
যদিও পরবর্তীতে ঘটনাটি বড় ধরনের শাস্তিমূলক পর্যায়ে পৌঁছায়নি, তবুও বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে মেসির প্রতিটি পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি নজর কেড়ে নেয়।
হোসেম হাসানের ‘এক্স’ ইঙ্গিত সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ এটিকে সম্ভাব্য বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে মনে করছেন ঘটনাটি অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে অসমর্থিত তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের আগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
এখন পর্যন্ত ফিফা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, তদন্তের ঘোষণা বা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করেনি।
ম্যাচের অফিসিয়াল রিপোর্টেও প্রকাশ্যে এমন কোনও গুরুতর ঘটনার উল্লেখ সামনে আসেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও তথ্য প্রকাশের অপেক্ষা করতে হবে।
বিতর্কের আবহের মধ্যেও মাঠের পারফরম্যান্সে দারুণ ছন্দে রয়েছে আর্জেন্টিনা। মিশরের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় তুলে নেওয়া দলটির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
এখন তাদের লক্ষ্য বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, মেসিকে ঘিরে ওঠা বিতর্কের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নির্ভর করছে ফিফা বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের সম্ভাব্য আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের উপর।
মিশরের কোচ হোসেম হাসানের ‘এক্স’ ইঙ্গিত বিশ্বকাপে নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেও এখন পর্যন্ত লিওনেল মেসির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পক্ষে কোনও যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। ফলে বিষয়টিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে নয়, বরং চলমান আলোচনার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
ফুটবলের মতো বৈশ্বিক আসরে বর্ণবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনও অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। তাই ভবিষ্যতে ফিফা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যই এই বিতর্কের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট করবে।

