বিশ্বকাপ মানেই চাপ, নাটক আর ইতিহাস গড়ার মুহূর্ত। আর সেই মঞ্চেই আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করলেন লিওনেল মেসি। মিশরের বিপক্ষে এমন এক ম্যাচে আর্জেন্টিনা জয় ছিনিয়ে আনল, যেটা এক সময় পুরোপুরি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। আক্রমণ, মাঝমাঠ, রক্ষণ—সব দিক থেকেই ভুলে ভরা ছিল আর্জেন্টিনার খেলা। কিন্তু মাত্র ১৩ মিনিটের এক ঝড়ে বদলে গেল পুরো গল্প।
ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল আর্জেন্টিনা তাদের সেরা ছন্দে নেই। মাঝমাঠে বল ধরে রাখার মতো আত্মবিশ্বাস ছিল না, রক্ষণে বারবার ভুল হচ্ছিল, আর আক্রমণ ছিল বিচ্ছিন্ন। মিশরের খেলোয়াড়রা সেই সুযোগটা পুরোপুরি কাজে লাগায়।
মো সালাহদের দ্রুত আক্রমণে বারবার চাপে পড়ে আর্জেন্টিনা। রক্ষণভাগে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের ভুল পজিশনিং এবং সমন্বয়ের অভাবে দুই গোল হজম করে দল। স্কোরলাইন দাঁড়ায় ০-২। তখন মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপ থেকে বিদায় শুধু সময়ের অপেক্ষা।
এই ম্যাচে শুরুতে মেসিকে যেন চেনাই যাচ্ছিল না। তিনজন ডিফেন্ডারের নজরে তিনি কার্যত বন্দী ছিলেন। মিশরের বক্সে ঢোকাই কঠিন হয়ে পড়েছিল তাঁর জন্য। এমনকি একটি সহজ পেনাল্টিও মিস করেন তিনি, যা চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
একটি ফ্রি-কিক পোস্টে লেগে ফিরে আসে—সেদিন যেন ভাগ্যও তাঁর পক্ষে ছিল না। ৭২ মিনিট পর্যন্ত মেসিকে দেখে মনে হচ্ছিল, এই ম্যাচে হয়তো তাঁর পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না।
ঠিক তখনই আসে সেই জাদুকরী মুহূর্ত। ৭৩ মিনিটে মেসি নিজের অবস্থান বদলান। মাঝখান ছেড়ে ডান প্রান্তে চলে যান। আর সেখান থেকেই শুরু হয় আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের গল্প।
৭৯ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ক্রস থেকে হেড করে গোল করেন ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো। এই গোলেই ম্যাচে ফিরে আসে আর্জেন্টিনা। পুরো দল যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।
মাত্র চার মিনিট পর মেসি নিজেই গোল করেন। নিজের তৈরি আক্রমণ নিজেই শেষ করেন এক দুর্দান্ত শটে। স্কোরলাইন তখন ২-২। স্টেডিয়ামে উত্তেজনা তুঙ্গে।
শেষ মুহূর্তে, লাউতারো মার্তিনেজের ক্রস থেকে এঞ্জো ফের্নান্দেজ হেড করে তৃতীয় গোলটি করেন। ০-২ থেকে ৩-২—অবিশ্বাস্য এক জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
এই ম্যাচে মেসি শুধু গোল করেননি, পুরো দলের মানসিকতা বদলে দিয়েছেন। তাঁর পজিশন পরিবর্তন, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ, সুযোগ তৈরি—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন অনন্য।
একজন প্রকৃত নেতার মতো দলকে টেনে তুলেছেন তিনি। এমনকি যখন সবকিছু ভেঙে পড়ছিল, তখনও হাল ছাড়েননি। এটাই মেসিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।
ম্যাচ শেষে দেখা গেল এক ভিন্ন মেসিকে। তিনি কাঁদছেন। সতীর্থদের জড়িয়ে ধরছেন। এই কান্না শুধু জয়ের আনন্দের নয়, চাপ থেকে মুক্তিরও।
পুরো দল তাঁকে কাঁধে তুলে উদযাপন করেছে। এই দৃশ্যই বলে দেয়, মেসি শুধু একজন খেলোয়াড় নন—তিনি দলের হৃদয়।
যদিও আর্জেন্টিনা জিতেছে, কিন্তু সমস্যাগুলো এখনও রয়ে গেছে। রক্ষণভাগে অসংখ্য ভুল, মাঝমাঠে সৃজনশীলতার অভাব, আর আক্রমণে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট।
রদ্রিগো ডি পল ও ম্যাকঅ্যালিস্টারদের ব্যাক পাসের প্রবণতা আক্রমণের গতি কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে মেসিকেই বারবার নিচে নেমে এসে খেলা তৈরি করতে হচ্ছে।
এঞ্জো ফের্নান্দেজ ও জুলিয়ান আলভারেজ চেষ্টা করলেও ধারাবাহিকতা নেই। এর ফলে গোলের সুযোগও কম তৈরি হচ্ছে।
কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও কোচ লিওনেল স্কালোনির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। এই ভুলগুলো ঠিক না করলে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে টিকে থাকা কঠিন হবে।
মিশরের বদলে যদি প্রতিপক্ষ ফ্রান্স বা স্পেন হতো, তাহলে এই ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত। তাই দ্রুত দলকে গুছিয়ে নেওয়া জরুরি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে কখনও ০-২ পিছিয়ে থেকে ম্যাচ জেতেনি আর্জেন্টিনা। এমনকি ড্র-ও করেনি। সেই দিক থেকে এই জয় শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, ঐতিহাসিকও।
আর এই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন একটাই নাম—লিওনেল মেসি।
এই ম্যাচ প্রমাণ করে, যতক্ষণ মেসি আছেন, ততক্ষণ আর্জেন্টিনার আশা শেষ নয়। তিনি একাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারেন, অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন।
তবে শুধু মেসির উপর নির্ভর করলে চলবে না। পুরো দলকে একসঙ্গে উন্নতি করতে হবে। না হলে সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।
তবুও এই ১৩ মিনিটের ঝড় বিশ্বকাপ ইতিহাসে দীর্ঘদিন মনে থাকবে—একটি ম্যাচ, যেখানে সব ভুল ঢেকে দিয়েছিল এক মানুষের জাদু।
Discover more from News Bangla24x7
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

